খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩:৩ পিএম
মৈত্রেয়ী দেবী—একটি নাম, একটি চিন্তা, একটি জীবনদর্শন। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ন হন্যতে’ তাঁকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও স্থায়ী আসন।
‘ন হন্যতে’—অর্থাৎ যাকে বিনাশ করা যায় না। এই উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনবোধ, নারীর আত্মসচেতনতা, উপনিবেশিক সমাজব্যবস্থা, ইংরেজ শাসনামলের সামাজিক কাঠামো এবং এক গভীর মানবিক দর্শন। এই গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে লাভ করেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। উপন্যাসটি ইংরেজিতে ‘It Does Not Die’ নামে অনূদিত হয়ে বিশ্ব পাঠকের কাছেও সমাদৃত হয়।
মৈত্রেয়ী দেবীর জন্ম ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর, পিতার কর্মস্থল চট্টগ্রামে। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন একজন খ্যাতনামা দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক, মাতা হিমানী মাধুরী রায়। শৈশব কেটেছে তাঁদের পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর বরিশালের আগৈলঝরার গৈলা গ্রামে—যার প্রকৃতি ও মানবিক পরিবেশ তাঁর মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগেই, ১৯৩৪ সালে, তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মনোমোহন সেনের সঙ্গে। মনোমোহন সেন ছিলেন মংপুতে সিনকোনা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার এবং ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ সিনকোনা চাষ ও গবেষণায় বিশেষভাবে যুক্ত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী। মংপুতে অবস্থানকালে তাঁর আমন্ত্রণেই কবিগুরু ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে চারবার সেখানে গিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি ও আলাপচারিতা নিয়েই তিনি লেখেন মূল্যবান গ্রন্থ ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’, যা পরে ইংরেজিতে ‘Tagore by Fireside’ নামে অনূদিত হয়।
মাত্র ষোল বছর বয়সে শুরু হয় তাঁর সাহিত্যযাত্রা। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদিত’—যার ভূমিকায় ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘চিত্তছায়া’ তাঁকে একজন সংবেদনশীল ও চিন্তাশীল কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ—
স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ: দ্য ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি—বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রচর্চার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পদক প্রদান করে। তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বশান্তি বিষয়ে বহু ভাষণ দেন।
সাহিত্যের পাশাপাশি সমাজসেবায়ও ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘Council for Promotion of Communal Harmony’—সম্প্রীতির এক সাহসী উদ্যোগ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দেন। একই সময়ে কলকাতা থেকে প্রায় ২৪ মাইল দূরে বাদু গ্রামে ৯ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ—‘খেলাঘর’। কৃষি, মৎস্য, মৌ পালন, গো ও হাঁস পালনসহ এই প্রতিষ্ঠানটি হয়ে ওঠে শরণার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের আশ্রয় ও ভালোবাসার ঠিকানা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজ হাতে এই প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করেছেন।
সাহিত্য, মানবতা ও সম্প্রীতির পথে নিরলস পথচলা এই মহীয়সী নারী ১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
মৈত্রেয়ী দেবী শুধু একজন লেখক নন—তিনি ছিলেন এক নির্ভীক মানবতাবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর সৃষ্টি আজও বলে যায়—
ন হন্যতে—মানবিক সত্য, ভালোবাসা ও চেতনা কখনো বিনাশ হয় না।
মন্তব্য