খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে চৈত্র ১৪২৭ | ২৯ই মার্চ ২০২১ | 1145 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত কিছু গাছ নিয়ে আজ আলোচনা করবো। প্রাণী জগতের সব সদস্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই জৈবিক শক্তি ব্যবহার করেই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। জীববিজ্ঞানীরা এই উদ্ভিদজগতের সদস্যদের তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন- গুল্ম, লতা এবং বৃক্ষ। এই তিন ধরনের মধ্যে বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদই আমাদের বেশি পরিচিত। আমাদের পৃথিবীতে কিছু অভিনব চেহারা এবং বৈশিষ্ট্যধারী উদ্ভিদ রয়েছে। চলুন তবে জেনে নেয়া যাক বিশ্বের এমন কিছু অদ্ভুত গাছ সম্পর্কে-

এই গাছগুলো দেখতে বোতল আকৃতির। এই গাছগুলোর কাণ্ডের নিম্নভাগ পানির বোতলের মতো মোটা, যা ধীরে ধীরে চিকন হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। এমন অদ্ভুত আকৃতির কারণে স্থানীয়রা এ গাছগুলোর নাম রেখেছে বাওবাব গাছ। এদের বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাডানসোনিয়া। এরা মূলত শুষ্ক মরু এলাকায় বসবাসের উপযোগী হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। এই গাছগুলো তাদের বোতল আকৃতির কাণ্ডের ভিতর প্রচুর পরিমাণ পানি ধরে রাখতে পারে।

মরু এলাকায় জীবনধারণের জন্য এই পানি এক কথায় অপরিহার্য। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে এই পানি নিরাপদ রাখতে বোতল গাছগুলো বিষাক্ত এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে দেয়। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আফ্রিকাতে। তবে এই গাছের এক প্রজাতি অস্ট্রেলিয়াতেও পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী গোত্রের শিকারিরা প্রায়ই এই বিষাক্ত পদার্থটি তাদের তীরের ফলায় ব্যবহার করে।

ওক (ইংরেজি: Oak) হলো একপ্রকার শক্তকাঠের উপযোগী বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়া বুনো কুইরকাস গণের বৃক্ষ। এ গাছটি বিভিন্ন প্রজাতির রয়েছে। সমগ্র বিশ্বে তিনশতাধিক প্রজাতির ওক গাছ আছে। সকল প্রজাতির ওক গাছ থেকেই বৃহদাকারের বীজ জন্মায় যা একর্ন নামে পরিচিত। ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অনেক দেশেই ওক গাছ জন্মে থাকে। ঐ সকল অঞ্চলের লোকেরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওক গাছের জন্য গর্ববোধ করে থাকেন। উত্তর গোলার্ধের বনভূমিতে উৎপাদিত ওক গাছ মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াই বেড়ে উঠে এবং একচেটিয়াভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।

আধুনিক চাষাবাদ প্রণালীর পূর্বে একসময় ইংল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকাই ওক বৃক্ষে পরিপূর্ণ ছিল। অষ্টাদশ শতকে রয়েল নেভি বা রাজকীয় নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণের জন্য ব্যাপকভাবে ওক বৃক্ষ কর্তন করা হয়েছিল।

স্যান্ডবক্স গাছ: এটির বৈজ্ঞানিক নাম হুরা ক্রেপিটানস। এই জাতীয় গাছগুলো সাধারণত উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিষুবীয় অঞ্চলে জন্মায়। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন জঙ্গলে এই জাতীয় গাছ বেশি দেখা যায়। বাদামি রঙের মসৃণ কাণ্ডের উপর অসংখ্য কাটা থাকার কারণে এই জাতীয় গাছ খুব সহজে শনাক্ত করা যায়। এই কাঁটাগুলোর ভিতর বিষ থাকায় এর আঁচড়ে তীব্র চুলকানি শুরু হতে পারে।

এমন কণ্টক আবৃত থাকায় বানরজাতীয় প্রাণী গাছে উঠতে পারে না। স্থানীয়রা তাই এর নাম দিয়েছেন ‘মানকি নো ক্লাইম্ব ট্রি’ অর্থাৎ যে গাছে বানর চড়তে পারে না। প্রায় ৬০ মিটার বা ২০০ ফুট লম্বা এই গাছের মিষ্টি কুমড়া সদৃশ ফলগুলো পরিপক্ক হওয়ার পর সজোরে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের প্রভাবে ফলের ভিতর থাকা বীজগুলো ৩০ মিটার থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এই গাছের আরেকটি নাম ‘ডাইনামাইট গাছ’। অপরিপক্ক অবস্থায় এই ফল দিয়ে স্থানীয়রা কলমদানি তৈরি করেন।
এবারে কোনো একক গাছের বদলে অদ্ভুত একটি জঙ্গলের কথা জানাবো। আফ্রিকার দেশ নামিবিয়ার মরু এলাকায় অবস্থিত ক্যামেল থ্রন নামক এই মৃত গাছের জঙ্গলটি দেখলে সিনেমার ভুতুড়ে জঙ্গলের কথা মনে পড়ে যায়। মৃত এই ক্যামেল থ্রন প্রজাতির গাছগুলোর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৯০০ বছর আগে।

আনুমানিক এক হাজার বছর আগে এই এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হয়। তখন এখানে জলাবদ্ধতার সুযোগে এই ক্যামেল থ্রন গাছগুলোর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু ১০০ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই এলাকা আবারো মরুভূমিতে পরিণত হয়। ফলে গাছগুলো মরে যায়। এরপর থেকে এই ভুতুড়ে জঙ্গলটি এখানেই এভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

পান্থপাদপ (ইংরেজি: traveller’s tree বা traveller’s palm), (দ্বিপদ নাম: Ravenala madagascariensis) হচ্ছে একটি মাদাগাস্কার বা মালিগাছি উদ্ভিদ প্রজাতি। এরা রাভেনালা গণের একমাত্র প্রজাতি। বাংলা ভাষায় ‘পান্থ’ মানে পথিক, আর ‘পাদপ’ শব্দের অর্থ গাছ। অর্থাৎ এদের বাংলা নামের অর্থ পথিকের গাছ।

এদের দেখতে কলাগাছের মতো, তবে লম্বাটে পাতাগুলো কাণ্ডের মাথায় দু’পাশ থেকে সারিবদ্ধভাবে উঁচানো অবস্থায় থাকে। এমন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই গাছকে কলাগাছ থেকে আলাদা করা যায়। শরৎ ও হেমন্ত কালে এদের ফুল ফোটে। উঁচান বড় বড় ডাঁটায় নৌকাকৃতি পত্রপুট, তাতে দ্বিলিংগ ফুল। ফল ৩-কোষী, শক্ত ও স্বয়ংবিদারী। বীজ হয় অনেক। গোড়ার চারা ও বীজ থেকে বংশবৃদ্ধি হয়। অনেকেই বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এই গাছ লাগান।
এই গাছটি দেখতে খুবই অদ্ভুত। ইয়েমেনের অন্তর্ভুক্ত সুকাত্রা দ্বীপপুঞ্জে জন্মানো এই গাছগুলোর কাণ্ড থেকে রক্ত লাল রঙের এক ধরনের নির্যাস বের হয়। সেই নির্যাস গর্ভপাতের প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করেন স্থানীয়রা। ওষুধে ব্যবহারের পাশাপাশি রং, সুগন্ধি, বার্নিশ এবং লিপস্টিকের মতো প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদনে এই ড্রাগনস ব্লাড পদার্থটি ব্যবহার করা হয়। চিরসবুজ এই ড্রাগনস ব্লাড গাছগুলো দেখতে খোলা ছাতার মতো।

আনুমানিক ৫০ লাখ বছর আগে উত্তর আফ্রিকার মরক্কো থেকে শুরু করে আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন পর্যন্ত এক বিশাল ক্রান্তীয় জঙ্গলের অস্তিত্ব ছিল। আদিম সেই জঙ্গলের অধিকাংশ গাছই ছিল এই ড্রাগনস ব্লাড জাতীয়। কালের পরিক্রমায় পৃথিবীর এই অঞ্চলটি মরু প্রধান হয়ে পড়ায় এই জাতীয় গাছের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। এ জাতীয় গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ড্রেসিনা সিনাবারি।
বৃহত্তম জীবের খেতাবটি প্যান্ডো বা ট্রেম্বলিং জায়ান্ট নামে পরিচিত একটি অ্যাসপেন বনের দখলে রয়েছে। ভাবছেন, একটি বন কীভাবে একক জীব হিসেবে গণ্য হয়? এর কারণ বিজ্ঞানীরা যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত এই বনের অ্যাসপেন গাছগুলোর জিন পরীক্ষা করে জানতে পারেন, এই বনের প্রতিটি গাছ একে অপরের ক্লোন হিসেবে বেড়ে উঠেছে। অর্থাৎ এই বনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় ৪০ হাজার গাছের ডিএনএ হুবহু একই রকম।

সব মিলিয়ে প্যান্ডোর আয়তন ১০৮ একর বা প্রায় সাড়ে চার লাখ বর্গ মিটার। তার সবগুলো গাছের সম্মিলিত ওজন আনুমানিক ৬০ লাখ বা ছয় হাজার টন। শুধু বিশ্বের বৃহত্তম জীবই না, এই অ্যাসপেন বনটি একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী জীব। একেকটি অ্যাসপেন গাছ ১০০ থেকে দেড়শো বছরের বেশি বাঁচে না। কিন্তু এই বনের পুরোটা জুড়ে বিস্তৃত শেকড় ব্যবস্থার বয়স ১৪ হাজার বছরের বেশি।

অ্যাসপেন বনটি গত শতকের শুরু থেকে ইউটা অঙ্গরাজ্যের ফিশ লেক ন্যাশনাল পার্কের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ন্যাশনাল পার্কটির ওয়েবসাইটে এই বনের বয়স ৮০ হাজার বছর উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা এই দাবির সঙ্গে একমত নন। সম্প্রতি দাবানল এবং এক জাতীয় ছত্রাকের সংক্রমণে এই বনে বেশ কিছু অ্যাসপেন গাছ মরে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় অ্যাসপেন অ্যালায়েন্স নামক একটি সংগঠন ছত্রাক সংক্রমণের প্রতিষেধক আবিষ্কারে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

এই গাছটি বর্ণিল দেখে এটির নাম রেইনবো ইউক্যালিপটাস বা রংধনু গাছ। এই জাতীয় গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ইউক্যালিপটাস ডিগ্লুপ্টা। পৃথিবীতে ৭০০ এর বেশি ইউক্যালিপটাস প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যেই রংধনু ইউক্যালিপটাসই কেবল অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায় না। প্রাকৃতিকভাবে এই জাতীয় ইউক্যালিপটাস ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং পাপুয়া নিউগিনির রেইনফরেস্টে জন্মে থাকে। তবে এ কাণ্ডের সৌন্দর্য এবং সুগন্ধির কারণে সম্প্রতি এই জাতীয় ইউক্যালিপটাস পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও রোপণ শুরু হয়েছে।

এই জাতীয় ইউক্যালিপটাস সাধারণত ৬০ থেকে ৭৫ মিটার বা ২০০ থেকে আড়াইশো ফুট লম্বা হয়ে থাকে। এর নামের সঙ্গে রংধনু বিশেষণ সংযুক্ত হবার কারণ এমনিতেই মসৃণ বাঁকলের রঙে কমলা আভা যুক্ত থাকে। তবে নিজে থেকেই গাছের বিভিন্ন স্থানে এই বাঁকল খসে ভিতরের কাণ্ড বেরিয়ে আসে। এই অংশগুলোর রং হালকা সবুজ, গাঢ় লাল এবং কমলা থেকে শুরু করে ধূসর, বাদামি এবং বেগুনি হতে পারে। সব মিলিয়ে এই গাছগুলোর কাণ্ডটা দেখে রংধনুর কথাই মনে পড়ে যায়।
আরও দেখুন: