আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সেপ্টেম্বর মাসের সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন ভারতের পুরুষ দলের অধিনায়ক শুবমান গিল এবং নারী দলের ওপেনার শেফালি ভার্মা। পুরুষ বিভাগে পঞ্চমবারের মতো এই স্বীকৃতি পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছেন গিল। অন্যদিকে, ব্যাট হাতে ধারাবাহিক সাফল্য ও অলরাউন্ড নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো মাসসেরা হয়েছেন শেফালি।
সেপ্টেম্বরজুড়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে গিলের অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে পুরুষ বিভাগে এই পুরস্কারের অন্যতম দাবিদার করে তোলে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই তাঁর ব্যাট থেকে আসে মোট ৩৩৩ রান। বড় লক্ষ্য তাড়া করে জেতার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব, ধৈর্য এবং আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ভারতের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারী বিভাগে শেফালির সাফল্যের পেছনেও রয়েছে একাধিক টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স। এশিয়া কাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহের পাশাপাশি এশিয়ান গেমসে ব্যাট ও বল হাতে দলের জয়ে অবদান রাখেন এই ভারতীয় ওপেনার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গিলের রেকর্ডগড়া ব্যাটিং
সেপ্টেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন গিল। প্রথম ম্যাচে ১০৮ বলে ১১০ রান করেন তিনি। পরের ম্যাচে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৩৩ বলে অপরাজিত ২২৩ রানের এক অসাধারণ ইনিংস। দুই ম্যাচেই বড় রান পাওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ সামাল দিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন ভারতীয় অধিনায়ক।
গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে প্রথমে ব্যাট করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৭ উইকেটে ৪০৫ রান সংগ্রহ করে। দলটির ওয়ানডে ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম ৪০০ বা তার বেশি রানের ইনিংস। এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ব্যাটাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলেন।
গিলের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে অসাধারণ ব্যাটিং করেন অভিজ্ঞ ওপেনার রোহিত শর্মা। মাত্র ৭৫ বলে ১০১ রান করেন তিনি। দুই ব্যাটারের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ২৫৫ রান, যা ভারতের মাটিতে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের উদ্বোধনী জুটির রেকর্ড গড়ে।
ম্যাচটিতে গিল মাত্র ৬২ বলে শতরান পূর্ণ করেন। এর মাধ্যমে ওয়ানডেতে ভারতীয় অধিনায়কদের মধ্যে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন তিনি। পরে ১১৭ বলে দ্বিশতক পূর্ণ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম দ্বিশতকের কৃতিত্বও অর্জন করেন। সফলভাবে রান তাড়া করার ম্যাচে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডও গড়েন এই ডানহাতি ব্যাটার।
৪০৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত মাত্র ৩৯ বল হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করে। এমন বিশাল লক্ষ্য অতিক্রমে গিলের অপরাজিত দ্বিশতক ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সিরিজের প্রথম ম্যাচেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ২৯৫ রানের লক্ষ্য ৪১.৪ ওভারে পেরিয়ে যায় ভারত। শেষ পর্যন্ত তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয় দলটি। গিলের ধারাবাহিক ব্যাটিং পারফরম্যান্স ভারতকে সিরিজ জেতানোর পাশাপাশি তাঁকে আইসিসির মাসসেরা পুরস্কারের দৌড়ে এগিয়ে রাখে।
পঞ্চমবার মাসসেরা হয়ে গিলের নতুন রেকর্ড
আইসিসির মাসসেরা পুরুষ ক্রিকেটারের পুরস্কার এবার নিয়ে পঞ্চমবার জিতলেন গিল। এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও সেপ্টেম্বরে এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুলাইয়ে এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি।
পঞ্চমবার পুরস্কার জয়ের মধ্য দিয়ে পুরুষ ক্রিকেটারদের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যকবার মাসসেরা হওয়ার রেকর্ড এককভাবে নিজের করে নিয়েছেন গিল। এই অর্জন তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক উন্নতি এবং বড় ম্যাচে কার্যকর ভূমিকার প্রতিফলন।
ভারতের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুধু রান করায় সীমাবদ্ধ নয়; দলকে চাপের মুখে এগিয়ে নেওয়া এবং বড় লক্ষ্য তাড়ায় ব্যাটিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে তাঁর পারফরম্যান্সে সেই সামর্থ্যের প্রমাণ মিলেছে।
এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসে শেফালির দাপট
নারী বিভাগে মাসসেরা হয়েছেন ভারতের ২২ বছর বয়সি ওপেনার শেফালি ভার্মা। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে ভারতের নারী দলের বিশ্বকাপজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর প্রথমবারের মতো আইসিসির মাসসেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। এবার এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দ্বিতীয়বারের মতো এই পুরস্কার এনে দিয়েছে।
এশিয়া কাপে পাঁচ ইনিংসে ২৩৬ রান করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হন শেফালি। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৬৪ রান করার পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালে করেন ৬৮ রান। তাঁর কার্যকর ব্যাটিংয়ে ভর করে ভারত রেকর্ড অষ্টমবারের মতো এশিয়া কাপের শিরোপা জেতে।
শেফালির ব্যাটিংয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন। তবে শুধু দ্রুত রান তোলাই নয়, দলের প্রয়োজন অনুযায়ী ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও তাঁর পারফরম্যান্সে স্পষ্ট হয়েছে।
এশিয়া কাপের পর জাপানের নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এই ওপেনার। তিন ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ছিল ১৮৮ রান। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মাত্র ৪৯ বলে অপরাজিত ১০০ রান করে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিজের প্রথম শতক তুলে নেন তিনি। স্বাগতিক জাপানের বিপক্ষে অপরাজিত ৪০ রানও করেন শেফালি।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে স্বর্ণপদকের ম্যাচে ব্যাট হাতে ৪৮ রান করার পাশাপাশি বল হাতেও অবদান রাখেন তিনি। ডানহাতি অফ স্পিনে শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের আউট করতে সক্ষম হন শেফালি। এশিয়া কাপে দুটি এবং এশিয়ান গেমসে চারটি উইকেট শিকার করেন তিনি। স্বর্ণপদকের লড়াইয়েও তুলে নেন দুটি উইকেট।
শেফালির ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সম্মিলিত অবদানে ভারত শ্রীলঙ্কাকে ১৪৭ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক সাফল্য কেবল ব্যাটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রয়োজনের সময় বল হাতেও দলের জন্য কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ভারতীয় ক্রিকেটের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রতিফলন
গিল ও শেফালির একই মাসে আইসিসির সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হওয়া ভারতীয় ক্রিকেটের দুই বিভাগেই প্রতিভা ও ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়। গিলের ক্ষেত্রে বড় লক্ষ্য তাড়া করে রেকর্ডগড়া ইনিংস খেলার সক্ষমতা তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। অন্যদিকে, শেফালি একাধিক প্রতিযোগিতায় ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়েও অবদান রেখে নিজের বহুমুখী দক্ষতা তুলে ধরেছেন।
আইসিসির মাসসেরা পুরস্কার সাধারণত নির্দিষ্ট মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতা ও দলের সাফল্যে তাঁদের অবদানের গুরুত্বও সামনে আনে।
গিলের পঞ্চমবারের জয় তাঁকে পুরুষ বিভাগে নতুন রেকর্ডের মালিক করেছে। শেফালির দ্বিতীয়বারের স্বীকৃতি আবার প্রমাণ করেছে, ভারতের নারী ক্রিকেটেও নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়মিত প্রভাব ফেলছেন। দুই ক্রিকেটারের এই অর্জন তাঁদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের ধারাকেও আরও উজ্জ্বল করেছে।


