ঢাকার ভবিষ্যৎ গণপরিবহন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অবকাঠামো প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ উত্তর এখন ব্যয়ের বড় ধাক্কার মুখে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনুমোদিত এই দুই প্রকল্পের ব্যয় ১ লাখ ২১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির কাজ যখন দরপত্র ও ঠিকাদার নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, তখন ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার উচ্চ ব্যয়ের অভিযোগ তুলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া স্থগিত ও পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়।
ব্যয় কমানোর যুক্তিতে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পর প্রকল্প দুটির কাজ দ্রুত এগোনোর বদলে সময় আরও বেড়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালের তুলনায় ডলারের দাম প্রায় ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, দেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থেকেছে, বৈশ্বিক বাজারে নির্মাণসামগ্রী ও শিল্প উপকরণের দাম বেড়েছে এবং ঠিকাদারদের নতুন দরপ্রস্তাবও আগের প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। ফলে যে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর কথা বলে কাজ আটকে দেওয়া হয়েছিল, কয়েক বছর পর সেটিই আরও বড় ব্যয়ের বোঝা নিয়ে ফিরে এসেছে।
এখন তাই শুধু প্রশ্ন নয়, বড় একটি অর্থনৈতিক হিসাবও সামনে এসেছে: অতিব্যয় ঠেকাতে প্রকল্প স্থগিত করার সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের কত টাকা সাশ্রয় হয়েছে এবং সেই বিলম্বের কারণে কত টাকা অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে?
আওয়ামী লীগ আমলে শুরু, ইউনূস আমলে স্থবিরতা
এমআরটি লাইন-১-এর পরিকল্পনার শিকড় আগের সময়ের হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত রূপ পায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। ২০১৯ সালে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল এবং নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত উড়ালপথ নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।
৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১-এর অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপানের ঋণ সহায়তা প্রায় ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন প্রায় ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা। মূল মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের বিমানবন্দর-কমলাপুর অংশের প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ এবং নতুনবাজার-পূর্বাচল অংশের প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পুরো প্রকল্পে ১৯টি স্টেশন রাখার পরিকল্পনা ছিল।
একই সময়ে এমআরটি লাইন-৫ উত্তর প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়। হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এই প্রকল্পের ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ১৪টি স্টেশনের মধ্যে নয়টি ভূগর্ভস্থ। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
অর্থাৎ দুই প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় মিলে প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই ব্যয় নির্ধারণের সময় দেশের অর্থনীতি, বিনিময় হার, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না।
২০১৯ সালের ৮৫ টাকার ডলার এখন ১২৪ টাকা
বর্তমান ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাগুলোর একটি পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে।
এমআরটি লাইন-১ অনুমোদনের সময় ডলারের মূল্য ছিল প্রায় ৮৫ টাকা। এমআরটি লাইন-৫-এর মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে প্রতি ডলারের মূল্য ধরা হয়েছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু সংশোধিত হিসাবের কার্যপত্রে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ একই এক ডলারের মূল্য টাকায় প্রায় ৪৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
বিষয়টি একটি সরল উদাহরণে বোঝা যায়। ২০১৯ সালে কোনো বিদেশি সরঞ্জাম কিনতে ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হলে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে তার মূল্য দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। একই ১০০ কোটি ডলারের মূল্য ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা দরে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিদেশি মুদ্রায় প্রকল্পের ব্যয় এক ডলারও না বাড়লেও শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে টাকায় ব্যয় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিনিময় হারেও গত কয়েক বছরে একই পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডলারের গড় দর ছিল প্রায় ৮৪ টাকা ৭৮ পয়সা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ৮৬ টাকা ৩৯ পয়সা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১১১ টাকায় উঠে যায়। ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করে ডলারের মধ্যবর্তী দর ১১০ টাকা থেকে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করে। পরে বাজারভিত্তিক চাপের সঙ্গে তা আরও বাড়ে।
মেট্রোরেলের মতো আমদানিনির্ভর প্রকল্পে এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ে। কারণ রেলগাড়ি, সংকেতব্যবস্থা, তড়িৎ ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা, বিশেষায়িত নির্মাণযন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের বড় অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
শুধু ডলার নয়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিও বড় কারণ
২০১৯ সালের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে একের পর এক বড় ধাক্কা এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর নির্মাণসামগ্রী, শিল্প উপকরণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি, ধাতু, শিল্প কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে এর সঙ্গে যুক্ত হয় টাকার অবমূল্যায়ন। ফলে বিদেশি সরঞ্জামের মূল্য একদিকে বিশ্ববাজারে বেড়েছে, অন্যদিকে একই পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে বেশি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
দেশীয় নির্মাণ খাতও এর বাইরে ছিল না। রড, সিমেন্ট, পরিবহন, জ্বালানি ও শ্রম ব্যয়ের বৃদ্ধি বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে ২০১৯ সালে করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের প্রাক্কলনকে ২০২৬ সালের বাজারদরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করলে স্বাভাবিকভাবেই বড় পার্থক্য তৈরি হবে।
এমআরটি লাইন-৫-এর সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাবেও ডিএমটিসিএল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, রেলগাড়ি, রেল ও তড়িৎ-যান্ত্রিক ব্যবস্থা, পরামর্শক ব্যয় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তাহলে ইউনূস আমলে প্রকল্প স্থগিতের প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখানেই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। তখন এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজে দরপত্র ও ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল।
ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর পুরোনো অনুমোদিত প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় সরকার প্রকল্পগুলোর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিছু প্যাকেজে দর এত বেশি ছিল যে তা পুরোনো প্রাক্কলনের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি।
এমআরটি লাইন-১-এর বিভিন্ন প্যাকেজের দর মিলিয়ে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবের কথা সামনে আসে, যেখানে মূল প্রকল্প ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এমআরটি লাইন-৫-এর কয়েকটি ভূগর্ভস্থ প্যাকেজেও প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলনের বিপরীতে ১১ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার দরপ্রস্তাব আসে।
এই উচ্চ দরকে অস্বাভাবিক মনে করে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত পার্থক্য রয়েছে। প্রকাশ্যে আসা সরকারি নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট দুর্নীতির তদন্তের ফল বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ সামনে আসেনি, যার ভিত্তিতে বলা যায়, দুর্নীতির প্রমাণের কারণেই প্রকল্প দুটির কাজ বন্ধ করা হয়েছিল। বরং মূল আপত্তি ছিল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ঠিকাদারদের দর অনেক বেশি হওয়া।
অর্থাৎ আগের সরকারের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা হলেও, দুর্নীতির নির্দিষ্ট প্রমাণ ও তদন্তের ফল প্রকাশ না করেই উচ্চ ব্যয়ের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই এখন যাচাইয়ের বিষয়।
ইউনূস আমলের সিদ্ধান্তই কি ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ?
প্রকল্প স্থগিত বা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে সময়ের ওপর। যে প্রকল্পের দরপত্র ও ঠিকাদার নিয়োগ দ্রুত শেষ করার কথা ছিল, সেই প্রক্রিয়ায় নতুন করে সময় গেছে। আর সেই সময়ের মধ্যেই ডলারের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর পরিবর্তিত হয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৪ সালে যদি উচ্চ দর কমানোর জন্য অপেক্ষা করা হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৪ সালের পর প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় আরও ব্যয়বহুল হয়েছে। ৮৫ টাকার ডলারের জায়গায় ১২০ থেকে ১২৪ টাকার ডলার দিয়ে একই বৈদেশিক ব্যয় পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে পুরোনো দর কমলেও প্রকল্পের টাকার অঙ্কে ব্যয় কমবে, এমন নিশ্চয়তা আর থাকেনি।
বরং বিলম্বের কারণে নতুন দরপত্রে ঠিকাদারদের ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও বেড়ে থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে মুদ্রার বিনিময় হার ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্য কী হবে, তা নিশ্চিত না থাকায় ঠিকাদাররা ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করতে পারে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ নির্মাণের মতো জটিল কাজে এই ঝুঁকি মূল্যায়নের মাত্রা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এখানে তাই মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২৪ সালে যে অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর যুক্তিতে দরপত্র আটকে দেওয়া হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের কারণে পরবর্তী দুই বছরে প্রকল্পের কত টাকা সাশ্রয় হয়েছে এবং কত টাকা অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে।
এই হিসাব ছাড়া সিদ্ধান্তটিকে অর্থনৈতিকভাবে সফল বলা কঠিন।
সময় যত বেড়েছে, ব্যয়ের চাপও তত বেড়েছে
এমআরটি লাইন-১-এর মূল মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর। কিন্তু প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৫ সালের শুরুতেই প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না এবং আরও কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫-এর মূল মেয়াদ ছিল ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সংশোধিত প্রস্তাবে তা ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। যাত্রী চলাচল শুরুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০৩৩ সালের জানুয়ারি।
এমআরটি লাইন-১-এর মেয়াদও ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সময় বাড়ার অর্থ শুধু নির্মাণকাজ দেরি হওয়া নয়। প্রকল্পের পরামর্শক, তদারকি, প্রশাসন, ভূমি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হয়। পাশাপাশি নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দামও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ৫ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত বাড়লে পুরোনো প্রাক্কলন কার্যত একটি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
ঠিকাদারের দর কি শুধু ডলারের কারণে এত বেশি?
এখানে আবার পুরো ব্যয় বৃদ্ধিকে শুধু ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্ত বা ডলারের মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না।
কারণ কিছু প্যাকেজে ঠিকাদারদের দেওয়া দর বৃদ্ধির মাত্রা এত বেশি যে সেখানে আলাদা কারণ খুঁজতে হবে।
এমআরটি লাইন-৫-এর একটি প্যাকেজে মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। পরে পরামর্শকের সংশোধিত প্রাক্কলন দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। কিন্তু সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব আসে প্রায় ১১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা।
আরেকটি প্যাকেজে মূল প্রাক্কলন ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলন দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। সেখানে সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব আসে প্রায় ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এখানে তিনটি আলাদা স্তর রয়েছে: পুরোনো সরকারি প্রাক্কলন, পরবর্তী সংশোধিত প্রাক্কলন এবং ঠিকাদারের দরপ্রস্তাব।
এই তিনটির পার্থক্য বিশ্লেষণ না করে পুরো ব্যয় বৃদ্ধিকে শুধু ডলারের দাম বা মূল্যস্ফীতির ফল বলা যাবে না। একইভাবে পুরো ব্যয় বৃদ্ধির দায় শুধু আগের সরকারের প্রাক্কলন বা পরবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরও চাপানো যাবে না।
ঠিকাদারদের বাজার প্রতিযোগিতা, জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাত্রা, ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ঝুঁকি, চুক্তির শর্ত, ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা এবং প্রকল্পের নকশাগত পরিবর্তনও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে।
ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা সাশ্রয় করল?
এখানেই ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ফলাফল নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যদি উচ্চ দর প্রত্যাখ্যান করে নতুন করে কম দরে কাজ করানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এখন সরকারকে দেখাতে হবে সেই সিদ্ধান্তে কত টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সঙ্গে দেখাতে হবে, সিদ্ধান্তের কারণে কত সময় প্রকল্প পিছিয়েছে এবং সেই সময়ের ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও নির্মাণ ব্যয়ের কারণে কত টাকা অতিরিক্ত যোগ হয়েছে।
এই দুই হিসাব পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে, সিদ্ধান্তটি প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের অর্থ বাঁচিয়েছে, নাকি ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তই পরে ব্যয় বাড়ানোর কারণ হয়েছে।
কারণ ২০২৪ সালে প্রকল্পের দর নিয়ে আপত্তি তোলার সময় একদিকে ছিল পুরোনো প্রাক্কলন, অন্যদিকে ছিল উচ্চ দরপ্রস্তাব। ২০২৬ সালে এসে সেই একই প্রকল্পের সামনে রয়েছে আরও দুর্বল বিনিময় হার, বেশি নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘায়িত বাস্তবায়নকাল।
অর্থাৎ যে ব্যয় কমানোর যুক্তিতে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে দেওয়া হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তের সময়ক্ষেপণের অর্থনৈতিক মূল্যও এখন প্রকল্পের মোট ব্যয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিদ্বেষের অভিযোগ কতটা প্রমাণযোগ্য?
এখানে রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যকে আলাদা করা জরুরি।
আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপকভাবে পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আসে। এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-ও সেই প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল না। রাজনৈতিকভাবে আগের সরকারের প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা ছিল বলেই কোনো নির্দিষ্ট নথি কিংবা প্রমাণ ছাড়া প্রকল্প স্থগিত করা হয়।
দুর্নীতির নির্দিষ্ট তদন্ত বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ প্রকাশ না করে যদি শুধু অতিব্যয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে একটি কৌশলগত গণপরিবহন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যেটা অনেক বিশেষজ্ঞ এখন বলছেন ‘একমাত্র রাজনৈতিক বিদ্বেষ’।
বিশেষ করে পরে যদি দেখা যায়, ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পের ব্যয় আরও বেড়েছে, তাহলে সিদ্ধান্তটির অর্থনৈতিক ফলাফল জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা সরকারের দায়িত্ব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অতিব্যয় কমানোর নামে প্রকল্প আটকে দিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে আরও বেশি ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায়ও প্রকল্পের মোট ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
আজকের সোয়া লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব তাই শুধু অর্থের হিসাব নয়। এটি একই সঙ্গে একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের হিসাব: যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ব্যয় কমানোর জন্য, সেটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থ কতটা বাঁচিয়েছে আর কতটা বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়েছে, সেই হিসাবই এখন প্রকাশ্যে আনা জরুরি।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

