খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সরাসরি কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক যৌন পাচার ও নির্যাতনকাণ্ডের ছায়া এখন আছড়ে পড়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর। ডাউনিং স্ট্রিটে টানা সংকট, সংসদে দলের ভেতরের বিদ্রোহ এবং নিয়োগসংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে তার নেতৃত্ব ক্রমেই নড়বড়ে হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কেলেঙ্কারির অভিঘাত স্টারমারের প্রশাসনকে নৈতিকতা ও জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে; ব্যর্থ হলে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আটলান্টিকের দুই পারে পরিস্থিতির বৈপরীত্যও স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যে তদন্ত ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সক্রিয়—সংসদীয় কমিটি, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং দলীয় শৃঙ্খলা ব্যবস্থা একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের ২০১৯ সালের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নিশ্চিত করা হলেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে দেখা যায়নি। নতুন নথিতে কিছু প্রভাবশালী নাম উঠে এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি পদক্ষেপের গতি ধীর। এই ভিন্ন বাস্তবতা ব্রিটিশ রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক চাপের তীব্রতাকে আরও উন্মোচিত করেছে।
ব্রিটেনে রাজকীয় পরিবারও জনরোষের প্রতিফলনে কঠোর বার্তা দিয়েছে। রাজা তৃতীয় চার্লস সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে রাজকীয় উপাধি থেকে বঞ্চিত করা ও রাজকীয় বাসভবন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে নৈতিক প্রশ্নে ছাড় নেই। একই সময়ে এপস্টেইন নথির বৈশ্বিক বিস্তার—নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত আলোচনার ঢেউ—প্রমাণ করছে, কেলেঙ্কারির অভিঘাত কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ক্ষমতাকেন্দ্রের সামাজিক বৃত্তগুলো বিশ্বজুড়েই প্রশ্নের মুখে।
স্টারমারের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সাবেক মন্ত্রী পিটার ম্যান্ডেলসনের ঘটনায়। সংসদের প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতার কথা জেনেও তাকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত নথিতে ২০০৮ সালে দণ্ডিত হওয়ার পরও ম্যান্ডেলসনের যোগাযোগ বজায় রাখার তথ্য উঠে আসে। আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় গোপন তথ্য পাচারের সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত চলছে; তিনি হাউস অব লর্ডস ও লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন।
এই কেলেঙ্কারি ব্রিটিশ রাজনীতির দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক দশকে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী বদলের নজির জনগণের আস্থাকে নড়বড়ে করেছে। ভূমিধস জয় দিয়ে ক্ষমতায় এলেও দুই বছরের কম সময়ে স্টারমারের জনপ্রিয়তা ক্ষয় হয়েছে—সংসদে বিব্রতকর মুহূর্ত ও দলীয় কোন্দল তার নেতৃত্বকে দুর্বলতার প্রতীকে পরিণত করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি আসলে তিনটি প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে: ক্ষমতাকেন্দ্রে সামাজিক নেটওয়ার্কের অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক নিয়োগে নৈতিক যাচাইয়ের ঘাটতি এবং সংকটে নেতৃত্বের দৃঢ়তার অভাব।
| বিষয় | যুক্তরাজ্য | যুক্তরাষ্ট্র |
|---|---|---|
| তদন্তের গতি | সংসদীয় চাপ ও দলীয় শৃঙ্খলা সক্রিয় | সীমিত নতুন আইনি পদক্ষেপ |
| রাজনৈতিক মূল্য | ম্যান্ডেলসনের পদত্যাগ, স্টারমারের ওপর চাপ | বড় রাজনৈতিক পরিণতি বিরল |
| প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া | রাজকীয় পদক্ষেপসহ কঠোর বার্তা | নথি প্রকাশ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ গঠন হয়নি |
| জনমত | তীব্র জনরোষ ও গণমাধ্যমের চাপ | বিভক্ত প্রতিক্রিয়া |
সব মিলিয়ে, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি স্টারমারের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার প্রশ্ন নয়; এটি নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, নৈতিক মানদণ্ড এবং সংকটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আরেকটি দ্রুত নেতৃত্ব বদলের অধ্যায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।