কক্সবাজারে আদালত প্রাঙ্গণে বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর কয়েক মাসের মধ্যেই একই আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় বিচারক, আইনজীবী ও আদালতে আসা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা জজ পদমর্যাদার এক বিচারক জানিয়েছেন, গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক একজন বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান। ঘটনার পর আরও দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছমিউদ্দীনকে ডেকে বিষয়টি জানান। তাঁরা আদালত প্রাঙ্গণের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
বিষয়টি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছিল বলে ওই বিচারক জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পরও দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আদালতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত স্থানে একজন বিচারককে প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখানোর অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না হওয়ায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ওই ঘটনার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের কাছে লিখিতভাবে নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চেয়েছিলেন। বিচারকদের পক্ষ থেকে দেওয়া ওই চিঠিতে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, গানম্যান দেওয়া হয়নি। এমনকি নিরাপত্তা চেয়ে পাঠানো চিঠিরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যেই গত ২৪ মে দিনের বেলায় আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। আদালত চত্বরে এমন সহিংসতার ঘটনা বিচারক ও আইনজীবীদের পাশাপাশি মামলার কাজে আদালতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নান বলেন, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি তিনি আর দেখেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জেলার উখিয়া ও টেকনাফের অনেক এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই অপরাধীদের ভয়ে একধরনের নীরবতা নেমে আসে।
আইনজীবী সমিতির সভাপতির বক্তব্যে জেলার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি আদালতকেন্দ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। আদালত এমন একটি স্থান, যেখানে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক, পুলিশ ও বিভিন্ন পক্ষের মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেন। সেখানে অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা প্রকাশ্যে গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটলে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিচারকদের নিরাপত্তার জন্য আগে থেকেই সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি না, লিখিতভাবে নিরাপত্তা চাওয়ার পর কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং আদালত প্রাঙ্গণে পরবর্তী গোলাগুলির ঘটনায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।
একই সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি, প্রবেশপথে তল্লাশি এবং অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে আদালতের পরিবেশে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
কক্সবাজারে অপরাধপ্রবণতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় থাকে না; বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিবেশও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাই বিচারকদের নিরাপত্তা চেয়ে দেওয়া আবেদন এবং আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, সে বিষয়ে কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


