চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সংঘাতে ব্যবহারের জন্য বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী এক যুদ্ধকৌশলের রূপরেখা প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)–সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে পাঁচটি ধাপে সাজানো এই পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তেহরানের দাবি, কৌশলটি কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করে বিশ্ব অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ওমানে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাব্য আয়োজনের প্রাক্কালে এমন পরিকল্পনা প্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ না হলেও নিষেধাজ্ঞা, নৌপথে মুখোমুখি অবস্থান, ড্রোন ও সাইবার আক্রমণের অভিযোগ—সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ চলমান। এই প্রেক্ষাপটে পাঁচ ধাপের কৌশল প্রকাশ ইরানের প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা ও প্রতিশোধের প্রস্তুতি প্রদর্শনের বার্তা বহন করে।
প্রথম ধাপ: টিকে থাকার কৌশল ও পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি
ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা শুরু হলে তা প্রতিহত করার পাশাপাশি পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখাই হবে অগ্রাধিকার। পারমাণবিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোকে ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত বাংকারে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ‘সারভাইভ্যাবিলিটি’ বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। লক্ষ্য—প্রাথমিক ধাক্কা সামলে দ্রুত পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানো।
দ্বিতীয় ধাপ: যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তার ও মিত্রদের সক্রিয়করণ
তেহরান সংঘাতকে নিজ ভূখণ্ডের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে। কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের নীলনকশার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সক্রিয় করে ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর সমন্বিত চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয় ধাপ: সাইবার ও অবকাঠামোগত আঘাত
এই ধাপে ইরান সাইবার যুদ্ধকে মুখ্য অস্ত্র হিসেবে দেখছে। পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সাইবার আক্রমণ কম খরচে বড় ক্ষতির সুযোগ তৈরি করে—এই বাস্তবতাকে কাজে লাগানোর কৌশল এটি।
চতুর্থ ধাপ: হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি বাজারে চাপ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালীকে সাময়িকভাবে অচল করার হুমকি রয়েছে এই ধাপে। বিশ্ববাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ধারণা, নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হবে, তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে কূটনৈতিক চাপ বাড়বে এবং সংঘাত প্রশমনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার হবে।
পঞ্চম ধাপ: দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
সবশেষে ইরান দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্রের জনমত বড় আকারের ব্যয়বহুল সংঘাতে অনীহা দেখাতে পারে—এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে সংঘাতকে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলাই লক্ষ্য। চূড়ান্ত উদ্দেশ্য—ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করা।
মূল ধাপগুলোর সারসংক্ষেপ
| ধাপ |
প্রধান কৌশল |
লক্ষ্য |
| প্রথম |
ভূগর্ভস্থ সুরক্ষা ও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা |
প্রাথমিক হামলা সামলে প্রতিক্রিয়া |
| দ্বিতীয় |
আঞ্চলিক ঘাঁটিতে আঘাত ও মিত্র সক্রিয়করণ |
যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তার |
| তৃতীয় |
সাইবার আক্রমণ ও অবকাঠামোগত বিঘ্ন |
অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা |
| চতুর্থ |
হরমুজ প্রণালীতে চাপ |
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা |
| পঞ্চম |
মনস্তাত্ত্বিক ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ |
আলোচনায় ফেরাতে বাধ্য করা |
সব মিলিয়ে, ইরানের পাঁচ ধাপের এই রণকৌশল কেবল সামরিক মোকাবিলার পরিকল্পনা নয়; এটি কূটনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জনমত—সব কিছুকে একই সঙ্গে প্রভাবিত করার একটি সমন্বিত ছক। বাস্তবে এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।