উত্তরবঙ্গের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্যাসক্ষেত্রের আশায় পাবনার মোবারকপুরে গভীর খননকাজ শুরু

দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উত্তরবঙ্গের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর অঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বড় ধরনের পদক্ষেপে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। সুজানগর উপজেলার মোবারকপুরে ৬ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে ‘মোবারকপুর ডিপ-১’ নামে এক অনুসন্ধান কূপ খননের মূল অবকাঠামোগত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এই কূপ থেকে আগামী ২০ বছর দৈনিক অন্তত ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পুরো কার্যক্রমে সফলতা মিললে এটিই হবে উত্তরবঙ্গের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও বাণিজ্যিকভাবে সফল গ্যাসক্ষেত্র।

বাংলাদেশের আবিষ্কৃত ও সফলভাবে উত্তোলিত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রায় সবই চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে কেন্দ্রীভূত। ভৌগোলিক এই বৈষম্য কাটাতে পাবনা অঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনার খবর প্রথম সামনে আসে চার দশক আগে। ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা এ এলাকায় প্রথম অনুসন্ধান জরিপ চালায়। এরপর ১৯৮৩-৮৪ সালে জার্মানির একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স একাধিকবার আধুনিক জরিপ চালিয়ে ভূগর্ভে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোরালো উপস্থিতির প্রমাণ পায়।

জরিপের ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে সাঁথিয়া উপজেলার পাগলা গ্রামে ২৮ বিঘা জমি লিজ নিয়ে প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও খননকাজের সূচনা হয়। সে সময় কূপ খনন শেষে পরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে পাইপের মুখে সফলভাবে আগুন জ্বালানোও হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেখান থেকে চূড়ান্ত উত্তোলন শুরু না করে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় কোটি কোটি টাকা খরচে বাস্তবায়িত ওই প্রকল্প হঠাৎ থমকে যাওয়ায় ক্ষোভ জমেছিল স্থানীয়দের মনে। তবে বাপেক্স এখনো সেই লিজ নেওয়া জমি ও এলাকা রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

পাগলা গ্রামের আগের অনুসন্ধানস্থল থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে সুজানগর উপজেলার আহমেদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে এবার নতুন করে ছয় একর জমিতে ‘মোবারকপুর ডিপ-১’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ এগোচ্ছে। এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা খরচে ৪.৫ কিলোমিটার গভীরে একটি কূপ খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূগর্ভে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ এবং তৎকালীন সীমিত প্রযুক্তির কারণে প্রকল্পটি স্থগিত করতে হয়েছিল। তবে এবার সেই পুরোনো অভিজ্ঞতা ও অতীত সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠে আধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ছক কষেছে সংস্থাটি।

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয় ও কাজের খাত সুনির্দিষ্ট তথ্য ও বিবরণ
প্রকল্পের নাম ও অবস্থান মোবারকপুর ডিপ-১, কুড়িপাড়া গ্রাম, সুজানগর, পাবনা
প্রকল্পের ভূমির পরিমাণ ৬ একর (উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক হস্তান্তরিত)
প্রাক্কলিত গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট (সম্ভাব্য মেয়াদ ২০ বছর)
অনুমোদিত মোট প্রকল্প ব্যয় ৩টি গভীর কূপের জন্য একনেকে ১,১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা
অবকাঠামো ও পাইলিং ব্যয় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা (শুরু: ২৭ জুলাই)
অবকাঠামো সমাপ্তির লক্ষ্য চলতি বছরের ডিসেম্বর
মূল ড্রিলিং কন্ট্রাক্টর সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (চীন)
মূল কূপের ড্রিলিং গভীরতা ৬ কিলোমিটারেরও বেশি (অতি গভীর)
মূল খননকাজের সময়কাল ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি
গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাব্য সময় ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ

বাপেক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) ও প্রকল্প পরিচালক এস এ এম মেরাজুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি বর্তমানে কুমিল্লায় তাদের চলমান খননকাজ শেষ করেই ভারী ড্রিলিং রিগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাবনার এই প্রজেক্ট সাইটে সরিয়ে আনবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, এই ডিপ ড্রিলিং প্রযুক্তি ভূগর্ভস্থ উচ্চ চাপ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। সুজানগরে যদি এই কূপ সফল হয়, তবে উত্তরবঙ্গের শিল্পায়ন, শক্তি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটবে।

Tags :

মোঃ সাকিব হোসেন | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।