এলএনজি সংকটে বন্ধ এক্সিলারেটের টার্মিনাল, গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস

আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় চরম জ্বালানি সংকটে পড়েছে দেশ। নির্দিষ্ট সময়ে নতুন কার্গো না আসায় মজুত ফুরিয়ে অবশেষে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)। বুধবার দুপুরে টার্মিনালটি গ্যাসশূন্য হয়ে পড়ায় জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সরবরাহ রাতারাতি এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে। আপাতত সামিট গ্রুপের একমাত্র সচল টার্মিনালের ওপর ভরসা করে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ সচল রাখা হচ্ছে, যা দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাসাবাড়ির গ্যাস সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বুধবার দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে থাকা এলএনজির মজুত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে ওই সময় থেকেই টার্মিনালটি থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়। অথচ সকালের দিকেও দুটি টার্মিনাল থেকে যৌথভাবে গ্যাস সরবরাহ প্রক্রিয়া সচল ছিল। বর্তমানে কেবল সামিটের এফএসআরইউ সচল রয়েছে এবং সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে দেওয়া হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বুধবার দুপুর ১২টার দিকেও দুই টার্মিনাল মিলিয়ে ৬৬ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট এলএনজি এবং দেশীয় কূপগুলো থেকে ১৬২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট সহ মোট ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টার দিকে এলএনজি সরবরাহ ১০ কোটি ঘনফুট কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে। ঐ একই সময়ে দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৬২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। সব মিলিয়ে সন্ধ্যায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস প্রবাহ নেমে এসেছে ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে। এক নিমেষে ১০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে সংকট তৈরি হতে শুরু করেছে।

টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার নেপথ্যে কার্গো পৌঁছাতে দেরি হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এর পেছনে কারিগরি জটিলতা ও তথ্যের নানা গরমিল ছিল। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এক্সিলারেটের টার্মিনালের বয়লারে ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামতের জন্য পেট্রোবাংলাকে ৭২ ঘণ্টার বিরতির কথা জানিয়েছিল পরিচালনা পর্ষদ। পরবর্তীতে দ্রুত সময়ের মধ্যে বয়লার মেরামতের কাজ শেষ হলেও ততক্ষণে আমদানিকৃত এলএনজি কার্গো ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের জটিলতা ও শিডিউল বিপর্যয় তৈরি হয়ে যায়। বয়লার প্রস্তুত থাকার পরও পর্যাপ্ত এলএনজি মজুত না থাকায় বাধ্য হয়ে টার্মিনালটির পরিচালন কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সময়মতো কার্গো এনে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে না পারা পেট্রোবাংলার দুর্বল ব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ। এতে করে টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো এলএনজি না পাওয়ায় একদিকে যেমন গ্যাস ঘাটতি তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে কার্গো কিনতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রের জ্বালানি ভর্তুকি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। আগামী ২৩ আগস্ট নতুন এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। যদি কোনো কারণে সেই কার্গো আসতে আরও দেরি হয় বা নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হয়, তবে জাতীয় গ্রিডের এই তীব্র গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হয়ে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর