কুমিল্লায় বহুল আলোচিত বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) এক নারী সদস্যসহ তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মামলায় দুই পুরুষ আসামিকে ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং নারী আসামিকে ৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুরে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৬) আদালতের বিজ্ঞ বিচারক খাইরুন নেছা এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে সাজা পরোয়ানামূলে কড়া পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে তাদের কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কুমিল্লা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. সাদেকুর রহমান এই রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কলমিডাঙ্গা গ্রামের মো. মোস্তাফিজুর রহমান (ওরফে মিন্টু, সামাদ ও রাজীব) এবং গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ দুরুল হুদা (ওরফে হাসান)। আদালত তাদের দুজনকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে, মামলার একমাত্র নারী আসামি ও দুরুল হুদার স্ত্রী খালেদা আক্তারকে (রানী) ৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথিপত্র ও এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ গভীর রাতে কুমিল্লা নগরের বিষ্ণুপুর এলাকার ‘রৌশন ভিলা’ নামক একটি বাড়িতে জঙ্গি আড্ডার খবর পায় তৎকালীন র্যাব-৭। র্যাবের ঢাকার সদর দপ্তরের হেফাজতে থাকা জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমানকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সে রাতে অভিযান চালানো হয়। রাতভর অভিযানে রৌশন ভিলা থেকে বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য, রাসায়নিক পদার্থ, নানা ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রিক ডেটোনেটর, ব্যাটারিসহ তিনজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
অভিযান শেষ হওয়ার পর তৎকালীন র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে কুমিল্লাসহ দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলমান এই বিচার প্রক্রিয়ায় আদালত আইনগত প্রক্রিয়া মেনে মোট ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। মামলা পরিচালনাকালে সাক্ষীদের উপস্থাপিত জবানবন্দি, আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য, জব্দতালিকা ও উদ্ধার করা বিস্ফোরক আলামতের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক এ রায় প্রদান করেন।
কুমিল্লা জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) কাইমুল হক রিংকু রায়ের পর জানান, রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও বিস্ফোরক দ্রব্য আদালতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হওয়ায় আসামিদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, নারী আসামি খালেদা আক্তারের সাজার সময় আদালত মানবিক কিছু দিক বিবেচনা করেছেন। খালেদা আক্তারের তিনটি শিশু সন্তান থাকা, তার স্বামী দুরুল হুদা নিজেও একই মামলায় দীর্ঘমেয়াদে কারাগারে সাজাভোগ করা এবং তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড বা অন্য মামলা না থাকাকে মাথায় রেখে তুলনামূলক কম সাজা দেওয়া হয়েছে।

