২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নের বিষয়ে মত প্রকাশ করেছেন। দেশের ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, যা ৬২ শতাংশের বেশি। আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ সুগম করেছে।
তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি ও কিছু রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) থাকায় সব সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর হবে না বলে সংবিধান বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের দায়িত্ব ভাগাভাগি, উচ্চকক্ষের গঠন ও কিছু সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাঠামো
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন তিন স্তরে অনুষ্ঠিত হবে:
-
আইনি ভিত্তি: রাষ্ট্রপতি ১৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেছেন।
-
গণভোট: ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটে জনগণ সরাসরি সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবসমূহের উপর মত প্রকাশ করেছেন।
-
সংসদীয় কার্যক্রম: নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধন প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।
গণভোটের ফলাফলের পরিসংখ্যান
| বিষয় | মোট ভোটার | ভোট প্রদান | হ্যাঁ ভোট | না ভোট | হ্যাঁ শতাংশ |
|---|---|---|---|---|---|
| জুলাই সনদ গণভোট | 12,77,00,000 | 7,76,95,000 | 4,80,74,429 | 2,25,65,627 | 62%+ |
সংবিধান সংশোধনের মূল দিকসমূহ
-
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিতকরণ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি।
-
প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি দলের প্রধান পদ পৃথক করা।
-
বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে সংবিধানভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন।
-
প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১০ বছর পদে থাকতে পারবেন।
বৃহত্তর রাজনৈতিক সহমত থাকলেও কিছু প্রস্তাবনায় বিএনপির আপত্তি রয়েছে। যেমন, দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী একই পদে থাকবেন না—এই বিষয়টি ইশতেহারে স্পষ্ট হলেও গণভোটের মাধ্যমে সরাসরি অনুমোদিত হয়নি। এজন্য বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকা প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হবে না।
উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বিতর্ক
গণভোটে উচ্চকক্ষের সংখ্যা ও গঠন সংক্রান্ত প্রশ্নও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চকক্ষ হবে ১০০ আসনের, যা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে গঠিত হবে।
| গঠন পদ্ধতি | বিএনপি জোট | জামায়াত জোট | এনসিপি |
|---|---|---|---|
| আসন সংখ্যার ভিত্তিতে | 70 | 26 | 2 |
| ভোটের অনুপাত অনুযায়ী | 52-53 | 38 | – |
বিএনপি তাদের ইশতেহারে উচ্চকক্ষ আসন বণ্টন আসন সংখ্যার ভিত্তিতে করার কথা উল্লেখ করেছে। এর ফলে গণভোটের প্রেক্ষিতে উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষণ
প্রধান উপদেষ্টা বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের মতে, “উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে গণভোটে সরাসরি ভোট হয়েছে, যা দলীয় ইশতেহারের তুলনায় বেশি প্রাধান্য পাবে। তাই বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকা প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হবে না।”
সংক্ষেপে, জুলাই সনদ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি ও অন্যান্য দলের আপত্তিকৃত কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না। তবে অন্য যে সংস্কারগুলোতে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো অব্যাহত থাকবে এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে তা সম্পন্ন করবেন।



