মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নাওজোড়, ভোগড়া, কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈরের কয়েকটি এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে জেলার অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ফলে সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুই পথে চলাচলকারী যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিপেটা করে। পরে বেলা সোয়া একটার দিকে প্রায় চার ঘণ্টা পর দুই মহাসড়কেই যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া নাশকতার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা শ্রমিক নন।
নাওজোড়ে মহাসড়ক অবরোধ, থমকে যায় যান চলাচল
শিল্প পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেডের শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বের হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাঁরা বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
একই সময়ে কোনাবাড়ীর বে ফুটওয়্যার, মৌচাক এলাকার পূর্বাণী এবং তেলিচালা এলাকার লগোস অ্যাপারেলস ও এটিএস অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরাও কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
অন্যদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময়ে ভোগড়া বাইপাস এলাকাতেও শ্রমিকেরা টায়ার জ্বালিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। সেখানেও পুলিশ একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেয়।
চন্দ্রায় বিক্ষোভ, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। পরে ওই এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
দিনের বিভিন্ন সময়ে জেলার একাধিক শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একাধিক স্থানে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা এবং শ্রমিকদের সড়কে অবস্থানের কারণে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
৬০ কারখানায় ছুটি, গ্রেপ্তার সাত
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়ে জেলার তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। তবে কোন কোন কারখানায় কত দিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানিয়েছেন, নাশকতার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা শ্রমিক নন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে এবং কোন কোন ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
কয়েক দিন ধরেই অস্থিরতা শিল্পাঞ্চলে
গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোথাও মহাসড়ক অবরোধ, কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ ও সহিংসতায় পুলিশ, সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের গাড়ি, বিভিন্ন যানবাহন এবং কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
ক্রমাগত অস্থিরতার কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শিল্প পুলিশের পাশাপাশি থানা-পুলিশ ও বিজিবিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে কাজ করেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, পণ্য সরবরাহ ও সামগ্রিক শিল্প কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মহাসড়ক অবরোধের কারণে রাজধানী ও উত্তরাঞ্চল এবং চট্টগ্রামমুখী বিভিন্ন রুটের পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনার অগ্রগতি—দুই দিকই এখন গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাও জরুরি।
মহাসড়ক সচল রাখা, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মঙ্গলবারের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হওয়া এবং ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরছে।


