তৈরি পোশাক, ওষুধ, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গাজীপুরে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। হত্যা, ছিনতাই, মহাসড়কে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার কারণে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ উঠেছে। মহাসড়ক থেকে আবাসিক এলাকার অলিগলি—অনেক স্থানেই সন্ধ্যার পর চলাচল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসা, পরিবহন, শ্রমিক নিয়োগ এবং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় অনেকে ঝামেলা বা হয়রানির আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করতেও আগ্রহী নন। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সম্প্রতি পশ্চিম জয়দেবপুরে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন মেডিকেল শিক্ষার্থী মাইশা ফৌজিয়া সৃজনী। তাঁর কানের স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পর তিনি জানান, নগরের অনেক সড়ক এখন ছিনতাইকারীদের কারণে অনিরাপদ মনে হয়। মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
কালিয়াকৈরে চাঁদা না দেওয়ায় হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন কাঁচামাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁর কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় এবং তিনি রক্তাক্ত জখম হন।
গাজীপুরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ৯ মে কাপাসিয়ার রাউৎকোনায় একই পরিবারের দুই শিশুসহ পাঁচজনকে হত্যা করা হয়। এর পরদিন কালিয়াকৈরের বাগচালায় গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। গাছায় এক অটোরিকশাচালককে গলা কেটে হত্যার ঘটনাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও মহাসড়ক থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।
এর আগে গত ২৯ এপ্রিল টঙ্গীর কেরানীরটেক এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হন। এসব ঘটনায় মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং স্থানীয় অপরাধচক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের জেলা সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
টঙ্গীর বাসিন্দা রিয়াজ হাসানের মতে, গাজীপুরে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে মাদক একটি বড় কারণ। তাঁর ভাষ্য, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারণে হত্যা, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বাড়ছে এবং সন্ধ্যার পর অনেক মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে স্বস্তি বোধ করেন না।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির প্রবণতা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় শিক্ষক মিয়াজ উদ্দিন। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চাঁদাবাজি দমনে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ব্যবসায়ী মহলে। ব্যবসায়ী জায়েদুল হামিদ বলেন, গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও পুরোপুরি নিরাপদ থাকার অনুভূতি তৈরি হয়নি।
গাজীপুর জজকোর্টের আইনজীবী সিরাজুল ইসলামও সন্ধ্যার পর মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি তথ্যেও গাজীপুরে হত্যাকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়। গাজীপুর মহানগর পুলিশের হিসাবে, মহানগর এলাকায় ২০২১ সালে ৫৫টি, ২০২২ সালে ৫৭টি, ২০২৩ সালে ৯৪টি, ২০২৪ সালে ৯৬টি এবং ২০২৫ সালে ৮১টি হত্যা মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ২৭টি।
অন্যদিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি থানায় ২০২১ সালে ২৭টি, ২০২২ সালে ৩৪টি, ২০২৩ সালে ৪৩টি, ২০২৪ সালে ৩৭টি এবং ২০২৫ সালে ৩২টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এসব থানায় ১৮টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে আসা মরদেহের সংখ্যাও গাজীপুরে অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। ২০২১ সালে সেখানে ৬৮৫টি, ২০২২ সালে ৬৩৪টি, ২০২৩ সালে ৬৬৫টি, ২০২৪ সালে ৭৮০টি এবং ২০২৫ সালে ৮৩০টি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আসে। চলতি বছরের ৯ জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩৫টিতে। এসব মৃত্যুর মধ্যে হত্যা, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু রয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য, গাজীপুরে সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি আগের তুলনায় কমেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অপরাধীরা গাজীপুরে এসে আত্মগোপন করে। কেউ কেউ সেখানে মাদক কারবার, ছিনতাই ও ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ে আবার অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত অন্য এলাকায় চলে যায়। শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থানের কারণে অপরাধীদের চলাচলের এই প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) মো. বেলায়াত হোসেন বলেন, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে মহানগর এলাকায় হত্যাকাণ্ড কমেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জেলা পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ কাজ করছে। সংঘটিত অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বলে জানিয়েছেন।
পরিসংখ্যান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যে অপরাধ পরিস্থিতির একটি ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পাঞ্চল, মহাসড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নিয়মিত নজরদারি, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং আলোচিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা গেলে জনমনে আস্থা বাড়তে পারে। গাজীপুরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নাগরিক জীবনের জন্য নয়, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।


