খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সিলেটের জকিগঞ্জে চাঞ্চল্যকরভাবে উদ্ধারকৃত যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিন ওরফে শফির (৫৯) দগ্ধ মরদেহের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তুচ্ছ মোটরসাইকেল নিয়ে বিরোধের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
নিহত বোরহান উদ্দিন সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার হাবিবুর আশিঘর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল যুক্তরাজ্যে প্রবাস জীবন কাটিয়ে সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। গত ৩০ জানুয়ারি তিনি সিলেট থেকে মোটরসাইকেলযোগে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নিখোঁজ হন। পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেট বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরবর্তীতে, ৩ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের সুলতানপুর ইউনিয়নের কোনারবন্দ হাওর থেকে একটি অজ্ঞাতপরিচয় পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় লাশটি নিখোঁজ বোরহান উদ্দিনের বলে শনাক্ত করে। এই ঘটনায় ৭ ফেব্রুয়ারি নিহতের বোন শাহ আসমা জাহান বাদী হয়ে জকিগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের তদন্ত এবং আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল একটি মোটরসাইকেল। বোরহান উদ্দিন যখন যুক্তরাজ্যে থাকতেন, তখন তার কেনা মোটরসাইকেলটি ব্যবহারের জন্য পরিচিত সাব্বির আহমেদকে দিয়েছিলেন। সম্প্রতি দেশে ফেরার পর বোরহান সেই মোটরসাইকেলটি সাব্বিরের কাছ থেকে ফেরত চান এবং সেটি অন্য একজনকে দেওয়ার কথা জানান। কিন্তু সাব্বির মোটরসাইকেলটি ফেরত দিতে গড়িমসি শুরু করেন। বোরহান বারবার চাপ দিতে থাকলে তাদের মধ্যে চরম বিরোধের সৃষ্টি হয়।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত ব্যক্তি | বোরহান উদ্দিন ওরফে শফি (৫৯), যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। |
| হত্যাকাণ্ডের তারিখ | ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬। |
| মরদেহ উদ্ধারের স্থান | কোনারবন্দ হাওর, সুলতানপুর ইউনিয়ন, জকিগঞ্জ। |
| মূল ঘাতক | সাব্বির আহমেদ (২১) ও তার সহযোগীরা। |
| হত্যাকাণ্ডের কারণ | পাওনা মোটরসাইকেল ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধ। |
| আসামিদের অবস্থা | ২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, ৩ জন গ্রেপ্তার। |
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা জানায়, ২৫ জানুয়ারি তারা বোরহানকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ জানুয়ারি সাব্বির তাকে মোটরসাইকেলে করে জকিগঞ্জের নির্জন হাওর এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে পূর্ব থেকে অপেক্ষায় থাকা অন্য সহযোগীদের নিয়ে বোরহানের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
আসামিরা তাকে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মারে এবং মাথায় হেলমেট দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে। একপর্যায়ে বোরহান নিস্তেজ হয়ে পড়লে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এরপর পরিচয় গোপন ও আলামত নষ্ট করতে লাশে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ড শেষে তারা মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায়।
সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসাইন জানান, মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ সূত্রহীন (Clue-less)। তবে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রহস্য উদ্ঘাটন করে। অভিযান চালিয়ে পুলিশ জকিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও লালাগ্রাম থেকে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে এবং নিহতের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে। জবানবন্দি দেওয়া দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং এই ঘটনায় জড়িত চতুর্থ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রবাসীদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে এই ঘটনাটি সিলেটে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে প্রবাসীদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।