খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
রোগ সৃষ্টিকারী মশার বংশবৃদ্ধি রুখতে এক অভিনব ও পরিবেশবান্ধব বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে শহরটির বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ছয় লাখ পুরুষ মশা অবমুক্ত করার একটি বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো মারাত্মক রোগের বাহক হিসেবে পরিচিত এশিয়ান টাইগার মশাসহ বিপজ্জনক জাতের স্ত্রী মশার বিস্তার ঠেকানোই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
মেরিল্যান্ডভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘বি সেফ মস্কিটো কন্ট্রোল’ ব্যতিক্রমী এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা জানান, যে মশাগুলো প্রকৃতিতে ছাড়া হচ্ছে, সেগুলোর সবই পুরুষ মশা এবং এগুলো ‘ওলবাকিয়া’ নামের বিশেষ এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত। ওলবাকিয়া মূলত প্রাকৃতিক কীট-পতঙ্গে পাওয়া একধরনের জীবাণু, যা মানবদেহের জন্য একেবারেই ক্ষতিকর নয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ মশাগুলো যখন সাধারণ পরিবেশের রক্তচোষা স্ত্রী মশার সাথে মিলনে আবদ্ধ হয়, তখন এক বিশেষ সাইটোপ্লাাজমিক বৈষম্য তৈরি হয়। এর ফলে স্ত্রী মশার ডিমগুলো থেকে আর কোনো বাচ্চা ফুটতে পারে না। এভাবে মশাগুলো কার্যত আজীবনের জন্য বন্ধ্যা হয়ে পড়ে এবং তাদের পরবর্তী বংশধর তৈরির প্রক্রিয়া পুরোপুরি থমকে যায়।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (ইপিএ) আগেই আশ্বস্ত করেছে। বিজ্ঞান অনুযায়ী, কেবল স্ত্রী মশাই প্রজনন ও ডিম পাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে মানুষকে কামড়ায় এবং রক্ত চোষে। পক্ষান্তরে, পুরুষ মশা শুধুই ফুলের মধু ও গাছের রস খেয়ে জীবনধারণ করে। ফলে এই লাখ লাখ পুরুষ মশা শহরের বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হলেও সাধারণ নাগরিক কিংবা গৃহপালিত পশুপাখির জন্য কামড়ানো বা বিরক্তির কোনো কারণ নেই।
বি সেফ মস্কিটো কন্ট্রোলের প্রধান টড মন্টগোমারি গণমাধ্যমকে জানান, ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার না করে কেবল জৈবিক পদ্ধতি ও প্রাকৃতিক আচরণের সুযোগ নিয়ে মশার প্রজনন থামানোর এই প্রযুক্তি বেশ সফল। পুরুষ মশা ছাড়ার ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে আসে, যা সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। পরিবেশের মূল বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি না করে নির্দিষ্ট জাতের ক্ষতিকর মশা দমন করার জন্য এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এ জাতীয় বন্ধ্যা মশা প্রয়োগের সফলতা নতুন কিছু নয়। এর আগেও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ায় ওলবাকিয়াভিত্তিক এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের প্রকোপ বহুগুণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কীটতত্ত্ববিদরা আশা করছেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে জুনের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এসব বন্ধ্যা মশা অবমুক্ত করার ফলে লোকালয়ে মশার উপস্থিতি ও রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।