খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েল যদি সব ধরনের সামরিক অভিযান ও হামলা বন্ধ না করে, তবে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য হবে না। গোষ্ঠীটির মতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত একতরফা হলে তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় এবং স্থায়ী শান্তির কোনো ভিত্তি তৈরি করবে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে আলজাজিরা জানায়, হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ বলেন, ইসরায়েল যদি স্থল, আকাশ ও সীমান্তবর্তী সব ধরনের শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধ না করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময় আসে যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল।
ফাদলাল্লাহ আরও জানান, সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সম্পর্কে হিজবুল্লাহকে অবহিত করেছেন বৈরুতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত। এতে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্ত রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহর অবস্থান অনুযায়ী, কার্যকর যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ সামরিক স্থগিতকরণ অপরিহার্য।
এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে কার্যকর হওয়ার কথা। তিনি আরও দাবি করেন, এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের—ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান রেজিন কেইনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ওই বৈঠককে সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি এর আগে বিশ্বের নয়টি যুদ্ধ বা সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রেখেছেন এবং এই প্রক্রিয়াকে নিজের দশম সফল কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে চান। তাঁর ভাষায়, এটি বাস্তবায়ন করতে পারা তার জন্য গর্বের বিষয় হবে।
নিচে বর্তমান পরিস্থিতি ও অবস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—
| পক্ষ | অবস্থান | মূল শর্ত/দাবি |
|---|---|---|
| হিজবুল্লাহ | যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা নয়, তবে শর্তসাপেক্ষ | ইসরায়েলকে সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে |
| ইসরায়েল | কূটনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ | নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা |
| যুক্তরাষ্ট্র | যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতা ও সমন্বয় | ১০ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব |
| ইরান (কূটনৈতিক সংযোগ) | হিজবুল্লাহকে অবহিত করেছে | আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখা ও আলোচনা সমন্বয় |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে যে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হলে কোনো সমঝোতা কার্যকর হবে না।
সামগ্রিকভাবে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে রাজনৈতিক ঘোষণা ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।