গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যু, হত্যার সন্দেহ পুলিশের

ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটির উপকণ্ঠে একটি হোমস্টেতে ২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী নিমিষা ঠাকুরিয়ার মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। শনিবার সকালে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তাঁর সঙ্গে থাকা ২৬ বছর বয়সী আশিক আলীকে আটক করেছে পুলিশ। তরুণীর মৃত্যু আত্মহত্যা বলে দাবি করেছেন আশিক; তবে তাঁর বক্তব্য আপাতত গ্রহণ করছে না পুলিশ। তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে হত্যার সন্দেহে খতিয়ে দেখছেন।

নিমিষা গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তিনি গুয়াহাটির ধরাপুর এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার সময় তিনি আশিক আলীর সঙ্গে শহরের উপকণ্ঠের গারাল-ধরাপুর এলাকার একটি হোমস্টেতে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে হোমস্টেটির নাম ‘রুদ্রাস কিচেন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ, তাঁদের সেখানে অবস্থানের সময় এবং মৃত্যুর কারণ—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায়।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আশিক দাবি করেছেন, নিমিষা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু গুয়াহাটি পশ্চিমের ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) বলিন দেউরি জানিয়েছেন, এই বক্তব্য পুলিশ সরাসরি বিশ্বাস করছে না। তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে তরুণীর শরীর বা মেঝেতে রক্তের দাগ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো নিমিষার শেষ ফোনকল নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য। পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি গৌতম দাসের দাবি, ওই রাতে নিমিষা তাঁর মাকে ফোন করেছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, মা।’ পরিবারের দাবি, এরপর ফোনটি সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় এবং যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফোন কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।

আরও সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নিমিষার বাবা দীপ ঠাকুরিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ফোনে মেয়েটি তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তাঁকে মারধর করা হয়েছে, বুকে ঘুষি মারা হয়েছে এবং তিনি আহত হয়েছেন। এই বক্তব্যটি তদন্তে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে—মৃত্যুর আগে নিমিষার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল। তবে পরিবারের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

হোমস্টের কর্মী ও কেয়ারটেকার বিপুল বাইলুংও পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে তিনি এক পুরুষের চিৎকার শুনেছিলেন। ওই ব্যক্তি কাউকে ‘দাদা, ওঠো, ওঠো’ বলে ডাকছিলেন। পরে কর্মীরা ঘটনাস্থলের দিকে গেলে নিমিষাকে মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে এবং আশিককে তাঁর পাশে দেখতে পান বলে বাইলুং জানিয়েছেন। এরপর হোমস্টের মালিককে জানানো হয় এবং অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়।

পুলিশের কাছে খবরটি আসে স্থানীয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে। সেখানে নিমিষাকে অচেতন অবস্থায় নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (জিএমসিএইচ) পাঠানো হয়। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ এরপর হোমস্টের মালিক, কেয়ারটেকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এদিকে, নিমিষার মৃত্যু ঘিরে গুয়াহাটিতে বিক্ষোভও হয়েছে। কিছু সংগঠন ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগ তুলেছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। শনিবার জাতীয় সড়ক-১৭ অবরোধের ঘটনাও ঘটে, যার ফলে বিমানবন্দরমুখী গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এসব অভিযোগ অবশ্য পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা মূলত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণেই গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এই মুহূর্তে নিমিষার মৃত্যুর কারণ নিয়ে দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে রয়েছে। একদিকে, তাঁর সঙ্গে থাকা যুবকের দাবি আত্মহত্যা; অন্যদিকে, পরিবারের বক্তব্য, শেষ ফোনকলের তথ্য এবং হোমস্টে কর্মীর বর্ণনা ঘটনাটিকে সন্দেহজনক করে তুলেছে। ময়নাতদন্তের ফল, ঘটনাস্থলের আলামত, ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে পুলিশ কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুকে চূড়ান্তভাবে হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যা—কোনোটিই বলা হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য ফরেনসিক ও তদন্ত-তথ্য পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।