আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপে জর্জরিত হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে একটি “চাপের বাজেট” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে সরকারকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। তিনি বলেন, রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় ও চলতি ব্যয় নির্বাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী ঋণের বোঝা এবং নতুন করে ঋণ গ্রহণের সীমিত সক্ষমতা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা দেশীয় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড. দেবপ্রিয় মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম বাজেটটি কেবল ব্যয় পরিকল্পনার দলিল না হয়ে বরং একটি সংস্কারমুখী ও বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক রোডম্যাপ হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে ব্যয়ের চাপ বেড়ে গেলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
নিচের সারণিতে আসন্ন বাজেটের প্রধান চাপ ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হলো—
| চাপের ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| জ্বালানি খাতের ব্যয় | আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা | আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রার ওপর চাপ |
| মূল্যস্ফীতি | উচ্চ পর্যায়ে বিদ্যমান | ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি |
| রাজস্ব আহরণ | লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে | উন্নয়ন ব্যয়ে ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি |
| বৈদেশিক মুদ্রা বাজার | অস্থিরতা বিদ্যমান | বিনিময় হার চাপ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি |
| ঋণ পরিস্থিতি | পূর্ববর্তী ঋণের বোঝা বিদ্যমান | বাজেট ঘাটতি পূরণে নতুন ঋণের চাপ |
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের বহুমাত্রিক চাপ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন অর্থবছরের বাজেট শুধু আর্থিক হিসাবের দলিল নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।c



