বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত প্রভাবশালী কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) দুপুরের দিকে সরকারি একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র গণমাধ্যমকে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তিনি একই সাথে প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছিলেন। হঠাৎ তাঁর এই পদত্যাগ সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং কূটনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পদত্যাগের প্রেক্ষাপট ও দায়িত্ব
ড. খলিলুর রহমানকে গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য তাঁকে ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ বা বিশেষ প্রতিনিধির মর্যাদা প্রদান করা হয়। তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো দাপ্তরিকভাবে জানানো হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত কারণ কিংবা প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ড. খলিলুর রহমানের শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রোফাইল
ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত সারণি নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| শিক্ষা (প্রাথমিক) | স্নাতকোত্তর, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৭)। |
| উচ্চশিক্ষা | এমএ এবং পিএইচডি (আইন, কূটনীতি ও অর্থনীতি), হার্ভার্ড ও টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়। |
| বিসিএস ক্যাডার | ১৯৭৯ ব্যাচ, পররাষ্ট্র ক্যাডার। |
| উল্লেখযোগ্য পদ | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব (১৯৮৩-৮৫)। |
| আন্তর্জাতিক দায়িত্ব | বিশেষ উপদেষ্টা, আঙ্কটাড (UNCTAD), জেনেভা (১৯৯১)। |
| সর্বশেষ পদ | জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ। |
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পরিক্রমা
ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগদান করেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি বড় অংশ অতিবাহিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তিনি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১ সালে তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
রোহিঙ্গা সংকট ও তাঁর ভূমিকা
রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে ড. খলিলুর রহমানের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ রক্ষা করছিলেন। তাঁর এই পদত্যাগের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণী কাজে সাময়িক শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগপত্র গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদটি কীভাবে পূরণ করা হবে, সে বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য আসেনি। তবে অভিজ্ঞ এই কূটনীতিকের প্রস্থান দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নে কী প্রভাব ফেলবে, তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে।



