তরুণদের অবহেলাই ইতালির পতনের মূল কারণ: ক্লিন্সমান

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি এবং চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বের প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে নাটকীয় পরাজয়ে আজ্জুরিদের এই স্বপ্নভঙ্গ হয়। নির্ধারিত এবং অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচটি ১-১ সমতায় থাকলেও টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। ইতালির এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীরা বিস্মিত ও মর্মাহত।

জার্মান ফুটবল কিংবদন্তি এবং সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান ইতালির এই ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে দেশটির ফুটবল কাঠামোর কঠোর সমালোচনা করেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে ইন্টার মিলান এবং সাম্পদোরিয়ার মতো ক্লাবে দীর্ঘ সময় কাটানো ক্লিন্সমানের ইতালীয় ফুটবলের প্রতি আলাদা আবেগ কাজ করে। তাঁর পুত্র জোনাথন ক্লিন্সমান বর্তমানে ইতালির ক্লাব চেসেনা এফসিতে গোলরক্ষক হিসেবে খেলছেন, যার ফলে ইতালির ফুটবলের সাথে তাঁর সংযোগ এখনো প্রগাঢ়।

নেতৃত্বের সংকট ও তরুণদের প্রতি অনাস্থা

ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ‘কোরিয়েরে দেল্লো স্পোর্ত’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্লিন্সমান তাঁর গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে বন্ধুদের সাথে বসে খেলাটি দেখার পর ইতালির হারে তিনি এতটাই ব্যথিত ছিলেন যে রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে আবেগ ছাপিয়ে তিনি দলটির কারিগরি ও মানসিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বর্তমান ইতালি দলে এমন একজন খেলোয়াড়ের অভাব রয়েছে যিনি একক দক্ষতায় প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারেন।

ক্লিন্সমান মনে করেন, ইতালির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর আস্থার অভাব এবং সেকেলে ফুটবলীয় কৌশল। তিনি স্পেন ও জার্মানির তরুণ তারকাদের উদাহরণ টেনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর মতে:

“লামিনে ইয়ামাল বা জামাল মুসিয়ালার মতো বিস্ময়কর প্রতিভারা যদি ইতালিতে জন্মাতেন, তবে তাদের সরাসরি মূল দলে সুযোগ দেওয়া হতো না। বরং অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে তাদের সম্ভবত দ্বিতীয় বিভাগে (সিরি-বি) খেলতে পাঠানো হতো।”

রক্ষণাত্মক কৌশল ও মানসিকতা

ইতালিয়ান ফুটবলের চিরাচরিত ‘কাতেনাচিও’ বা রক্ষণাত্মক কৌশল আধুনিক ফুটবলের গতির সাথে তাল মেলাতে পারছে না বলে ক্লিন্সমান দাবি করেন। অনেক কোচ এখনো জয়ের মানসিকতার পরিবর্তে ‘হার এড়ানোর’ কৌশল নিয়ে মাঠে নামেন, যা খেলোয়াড়দের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তরুণ খেলোয়াড়রা যখন ক্লাবে এবং জাতীয় দলে যথাযথ সুযোগ পান না, তখন সামগ্রিক ফুটবল কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইতালির গত তিনটি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের চিত্র এবং বর্তমান সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

বিষয় বিবরণ
সর্বশেষ বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ ২০১৪ (ব্রাজিল)
ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ।
সাম্প্রতিক প্রতিপক্ষ প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে হার।
প্রধান সমস্যা (ক্লিন্সমানের মতে) তরুণদের ওপর আস্থার অভাব, নেতৃত্বের সংকট ও অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতা।
তুলনামূলক উদাহরণ লামিনে ইয়ামাল (স্পেন) এবং জামাল মুসিয়ালা (জার্মানি)।

ভবিষ্যৎ পথচলা

ইতালি ইউরো ২০২০ জয়ের পর মনে করা হয়েছিল তারা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে। কিন্তু টানা তিনবার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশটির ফুটবলে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ক্লিন্সমানের মতে, যতক্ষণ না ইতালীয় কোচরা তরুণদের ওপর সরাসরি আস্থা রাখবেন এবং আধুনিক আক্রমণাত্মক কৌশল রপ্ত করবেন, ততক্ষণ বিশ্বমঞ্চে তাদের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। ইয়ামালের মতো তরুণদের সাহসী ব্যবহারই হতে পারে ইতালির জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।