চট্টগ্রামের শমসেরপাড়া এলাকায় টানা ছয় দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে আছে রেললাইন। অভূতপূর্ব এই জলাবদ্ধতার কারণে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য এই রুটে ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা আর ঘটেনি, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৪ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়। এর জের ধরে গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরের সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে শমসেরপাড়া পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশ প্রায় দেড় থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এরপর থেকেই লাইনে চাকা ঘোরেনি কোনো ট্রেনের। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় রেলের কর্মকর্তাদের কথায়—সাধারণত রেললাইনে পানির গভীরতা ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ট্রেন চালানো নিরাপদ নয়। অথচ শনিবার সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকা থেকে পানি কিছুটা নামলেও শমসেরপাড়ার প্রায় ২০০ মিটার অংশে তখনো ৯ ইঞ্চি পানি জমে ছিল। এই রুটে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন দুই জোড়া করে মোট চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। করপোরেট ও পর্যটন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ ব্যবস্থা হঠাৎ ভেঙে পড়ায় প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী মো. নুরুল আবসার নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, এবারের বৃষ্টিতে রেললাইনের পাশের বাড়িগুলোতে কোমরসমান পানি উঠে গেছে। দীর্ঘ জীবনে এই রেললাইনকে এত দিন ধরে পানির নিচে ডুবে থাকতে তিনি কখনো দেখেননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু এই রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিই ট্রেন বন্ধের একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংস্কার কাজের বড় ধরনের ত্রুটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রেলপথের পাশের নালা-নর্দমা ঠিকমতো পরিষ্কার না করা, আশপাশের বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করে ফেলা এবং খালের সুরক্ষা দেয়াল উঁচু করার কারণে পানি নামার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া, গত তিন দশকে নগরের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
১৯৩১ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি দীর্ঘকাল পর ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু বিশাল বাজেটের এই পুনর্বাসন প্রকল্পে এক অদ্ভুত গাফিলতি দেখা যায়—নিচু রেলপথটিকে উঁচু করার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি সে সময়। ২০১৯ সালে সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) তাদের প্রতিবেদনে এই কাজের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, রেল ট্র্যাকে প্রয়োজনীয় পাথর বা ব্যালাস্ট দেওয়া হয়নি, যার কারণে লাইন আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে এবং স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি সেতুতে ব্যবহৃত কাঠের স্লিপারগুলোর মানও ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে শতকোটি টাকা খরচের পরও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যায়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইন জানান, এলাকাটি নিচু হওয়ায় এবং পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে তলিয়ে যাওয়া অংশটি ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি উঁচু করে দ্রুত ট্রেন চালু করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় শমসেরপাড়া এলাকার পানি সরানোর জন্য রেললাইনের সমান্তরালে একটি নতুন খাল খনন এবং ২০ হেক্টরের একটি বিশাল জলাধার তৈরির সুপারিশ করা হয়েছিল। সিডিএর উপপ্রধান নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী জানান, এই দীর্ঘ সময়েও সেই খাল বা জলাধার তৈরি না করার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন।
তবে আশার কথা হচ্ছে, এবার প্রায় ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। নতুন এই প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম নগরের নিচু অংশের রেললাইন প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু করা হবে। সম্প্রতি দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, এই প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হলে ভবিষ্যতে যত ভারী বৃষ্টিই হোক না কেন, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ আর কখনোই ব্যাহত হবে না।



