খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ৮:২ এএম
বাংলাদেশের আইন ও সংবিধানের ইতিহাসে ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, রাষ্ট্রচিন্তক এবং ন্যায়বিচারের এক নির্ভীক অভিভাবক। সততা, প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মর্যাদার জন্য তিনি সর্বমহলে ‘জাতির অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে থেকে তিনি সারাজীবন রাষ্ট্র, আইন ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন।
ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরে। তাঁর পিতা সৈয়দ জাফর আহমেদ ছিলেন দিনাজপুরের হিলি অঞ্চলের বিশিষ্ট জমিদার ও ব্যবসায়ী।
শৈশবে তিনি হিলির রামনাথ ইংরেজি হাইস্কুল এবং পরে কলকাতা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব বাংলায় চলে এসে ১৯৪৮ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ, ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯৫৪ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। ১৯৫৮ সালে ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে বার-অ্যাট-ল এবং লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস (LSE) থেকে অর্থনীতিতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করে অল্প সময়েই অসাধারণ মেধা, যুক্তিবোধ ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যাদানের দক্ষতার মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের কাতারে স্থান করে নেন।
১৯৬০ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আইন পেশায় সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৯৭৬-১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আইনচর্চা, সাংবিধানিক বিশ্লেষণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে মতামত বিচারাঙ্গনে আজও সমানভাবে সমাদৃত।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি দুটি পৃথক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণেই রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানানুরাগী ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ড. সুফিয়া আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। তাঁদের দুই সন্তান—পুত্র সৈয়দ রিফাত আহমেদ, যিনি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং কন্যা ডা. রাইনা আহমেদ, একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক।
২০০৩ সালের ১২ জুলাই দেশের এই প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ন্যায়বিচারের অকুতোভয় প্রহরী পরলোকগমন করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ হারায় এক অসাধারণ আইনবিদ, রাষ্ট্রচিন্তক এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীককে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদকে। তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা, আইনের শাসনের প্রতি অটল বিশ্বাস এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় আজীবন অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মন্তব্য