খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশে নারীমুক্তির ধারার ইতিহাস শতাব্দী দীর্ঘ। এটি শুধু কিছু পরিচিত নাম বা ঘটনার কালানুক্রম নয়—বরং বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের শেষভাগে যখন নারী শিক্ষার পথ প্রায় নিষিদ্ধ, তখন কলমকে অস্ত্র হিসেবে ধরেছিলেন বেগম রোকেয়া। তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ কল্পকাহিনি নয়, বরং সমাজে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গির ঘোষণা।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ ও সামন্তবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন সহ্য করে আপসহীন ছিলেন ইলা মিত্র। অস্ত্র হাতে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পরবর্তী অধ্যায়ে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ ছিল স্পষ্ট। স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠে নানা নারীসংগঠন, যেমন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, যারা আইনি সংস্কার, পারিবারিক আইন, সহিংসতা প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে এসেছে।
আজকের বাংলাদেশে আমরা এক জটিল চিত্র দেখি। একদিকে নারীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে—শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, প্রশাসন, ব্যাংকিং, সেনাবাহিনী, স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসন এবং সামাজিক মিডিয়ায় নারীর সক্রিয়তা তার প্রমাণ। অন্যদিকে, অনলাইন ও অফলাইনে নারীবিদ্বেষী ভাষা ও সহিংসতা, রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, এবং কিছু শিক্ষিত নারীর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি সমর্থন দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।
| ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | চ্যালেঞ্জ |
|---|---|---|
| শিক্ষা | মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ভর্তির হার ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ | সমালোচনামূলক চিন্তা বৃদ্ধি প্রয়োজন |
| কর্মক্ষেত্র | তৈরি পোশাক, প্রশাসন, ব্যাংকিং, শিক্ষা, সেনাবাহিনী | কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য |
| স্বাস্থ্য | গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু হ্রাস | মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন ও Reproductive স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ |
| রাজনৈতিক অংশগ্রহণ | স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত আসন | জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব সীমিত |
| সামাজিক অবস্থা | সামাজিক মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ | অনলাইন সহিংসতা, নারীবিদ্বেষী মনোভাব |
ইতিহাস প্রমাণ করে সামাজিক অগ্রগতি সরলরেখায় এগোয় না। নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লে পারিবারিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়, যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কেবল পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার মধ্যেও প্রোথিত। অনেক নারী সেই কাঠামোর ভেতরেই নিরাপত্তা ও মর্যাদা খুঁজে পান।
শিক্ষা যদি সমালোচনামূলক চিন্তা না শেখায়, তবে ডিগ্রি থাকলেও মুক্তচিন্তা বিকশিত হয় না। তাই রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান কেবল শিক্ষার পরিমাণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বাংলাদেশ একরঙা নয়; এটি অগ্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার, প্রতিবাদ ও আপসের দেশ। শতাব্দীব্যাপী আন্দোলন আজ প্রশ্নের মুখে থাকলেও এটি ব্যর্থতার প্রমাণ নয়—বরং জীবন্ত থাকার নিদর্শন। প্রয়োজন:
আত্মসমালোচনা
শিক্ষায় সমালোচনামূলক চিন্তার প্রসার
নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি
সামাজিক ও ধর্মীয় সংলাপ
নতুন প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ
রোকেয়ার সময় যেমন লড়াই ছিল, আজও আছে; পার্থক্য শুধু কৌশলে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কোন শক্তিকে শক্তিশালী করতে চাই? অর্জন রক্ষা না করলে হারিয়ে যায়, এবং সংগ্রাম থেমে গেলে ইতিহাস পিছিয়ে যায়।
লেখিকা: হোসনেআরা জেমী
প্রবাসী কবি, লেখিকা ও সমাজসেবী।