প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমিত রক্তের অবৈধ বাণিজ্য

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে রক্তের অবৈধ বাণিজ্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারি নীতিমালা মেনে রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় রোগীরা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে রক্ত বিক্রি করছে, এমনকি এক ব্যাগ রক্তকে নরমাল স্যালাইন মিশিয়ে একাধিক ব্যাগে ভাগ করে বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালসহ মোট ৪৫২টি ব্লাড ব্যাংক আছে, তবে অবৈধভাবে এসবের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্লাড ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন ছাড়া ব্লাড ব্যাংক খোলা হচ্ছে এবং সেখানে রক্ত বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতালের আশপাশে এবং অলিগলিতেও ব্লাড ব্যাংকের সাইনবোর্ড ঝুলছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে অবশ্যই নিরাপদ রক্ত সরবরাহ করতে হবে। সরকারের অনুমোদন ছাড়া বা নীতিমালা অমান্য করে দেওয়া রক্ত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক পেশাদার রক্তদাতার রক্ত ব্যবহার করে, যারা অনেক সময় মাদকাসক্ত এবং সিফিলিস, গনোরিয়া, এইচআইভি (এইডস) এবং হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। এদের রক্ত দিয়ে রোগীকে রক্ত দেওয়ার ফলে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগের ঝুঁকি থাকে।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, রক্ত সংগ্রহের আগে হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে রক্ত নিরাপদ কি না। এরপর ক্রসম্যাচিং করে ব্লাড গ্রুপ মেলাতে হবে এবং রোগীর দেহে রক্ত দিতে হবে। বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনবিহীন ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর ব্লাড ব্যাংকে এই প্রোটোকল অনুসরণ করে রক্ত সরবরাহ করা হয়। তবে হাসপাতালের বাইরে দালালদের সক্রিয়তা বেশি। তারা রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে সরকারি ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত সংগ্রহ করাকে এড়াতে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত রোগীরা এ দালালদের খপ্পরে পড়ে সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত পেশাদার রক্তদাতার রক্ত ক্রয় করছেন।

মহাখালী গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ডা. এনামুল করিম বলেন, “পেশাদার রক্তদাতার রক্তে সংক্রামক রোগের সম্ভাবনা বেশি, তাই সরকারি নির্দেশনা মেনে রক্ত দেওয়া নিরাপদ।”
চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম. এন. হুদা বলেন, “হেপাটাইটিস বি ও সি, এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলো নিয়মিত মনিটরিংয়ে থাকা উচিত। পেশাদার রক্তদাতার রক্তের ব্যবসা বিপজ্জনক।”
অধ্যাপক ডা. কবির চৌধুরী বলেন, “নিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংক থেকে সরকারি প্রটোকল মেনে রক্ত দেওয়া নিরাপদ।”
গ্যাস্ট্রোলিভারের অধ্যাপক ডা. গোলাম কিবরিয়া বলেন, “প্রটোকলের কোনো ব্যত্যয় হলে রোগীর জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।”

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, “২,৬০০ বেডের এই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা চার সহস্রাধিক। এখানে রক্তের চাহিদা বেশি, তাই গাইনি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারের পাশে রক্ত সংগ্রহের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। রোগীর স্বজন দ্রুত রক্ত দিতে পারেন। বাইরে থেকে রক্ত কেনার প্রয়োজন নেই।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকার বাইরে ব্লাড ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের অফিস এবং জেলা পর্যায়ের সিভিল সার্জনের অফিসের নিয়মিত মনিটরিংয়ে থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিপজ্জনক রক্ত বাণিজ্য চলছেই।

Tags :

নিউজ ডেস্ক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।