রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) স্নাতক আবু সুফিয়ান ২০২০ সালে পড়ালেখা শেষ করেও পছন্দমতো চাকরি পাননি। বর্তমানে তিনি একটি দেশীয় অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তবে বেতনে সন্তুষ্ট নন। তার লক্ষ্য সরকারি চাকরি। দশম গ্রেডের চাকরির চেষ্টা করলেও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার জন্য সুযোগ সীমিত, কারণ এ গ্রেডের অধিকাংশ প্রকৌশলী পদ ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত।
আবু সুফিয়ানের মতো বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা মনে করেন, বেসরকারি চাকরিতে নিরাপত্তা নেই এবং সরকারি চাকরির পদ সংখ্যাও সীমিত। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দশম গ্রেডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে ডিপ্লোমাধারীদের একচেটিয়া সুযোগ দেওয়ায় বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, কুয়েটের মেধাবীরাও বেকার থাকছেন।
অন্যদিকে, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররাও নিজেদের বেকারত্বের জন্য চাকরির বাজারের অভাবকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটি পুরোপুরি তাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত, যা কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তিকে বেকারত্ব থেকে রক্ষা করবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকাই বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে এই রেষারেষির মূল কারণ। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দ্বন্দ্ব এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
প্রকৌশলীদের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন, যার নেতৃত্বে রয়েছে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে এবং প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
অন্যদিকে, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এর নেতৃত্বে ৭ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিকে বিক্ষোভ ও সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুই পক্ষের এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার চারজন উপদেষ্টা সমন্বয়ে একটি আট সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, সব পক্ষের কথা শুনে ন্যায্য সমাধান করা হবে।
বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি
দেশের চারটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, কুয়েট) সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ডিগ্রি নিয়ে বের হন। তারা নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদে চাকরির সুযোগ পেলেও এর সংখ্যা খুবই সীমিত। এ বাস্তবতায় তারা তিনটি দাবি তুলেছেন:
নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ ও ন্যূনতম যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার করা।
দশম গ্রেডে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদেরও আবেদনের সুযোগ দেওয়া।
শুধুমাত্র বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারীরাই যেন নামের সঙ্গে ‘প্রকৌশলী’ লিখতে পারে।
ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দাবি
দেশের পলিটেকনিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বছরে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করেন। তারা নিজেদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি দাবি করে বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত আসন বা কোটা চেয়ে আসছেন। তাদের ৭ দফা দাবির মধ্যে অন্যতম:
উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে শুধু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়োগ বহাল রাখা।
সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করা।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত সংগঠন আইডিইবি-এর অন্তর্বর্তী আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. কবীর হোসেন বলেন, “ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররাই মাঠে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের সব খাত থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা মেনে নেওয়া হবে না।”
চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা
এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ চাকরির বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা। বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ডিপ্লোমাধারীদের ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নন এবং তাদের ‘ডিপ্লোমা টেকনোলজিস্ট’ হিসেবে সম্বোধন করতে চান। অন্যদিকে, ডিপ্লোমাধারীরা মনে করেন তারা হাতে-কলমে কাজ করায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে বেশি পারদর্শী।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উভয় পক্ষই গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকট সমাধানে সিলেবাস সংস্কারের পাশাপাশি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বুয়েটের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জানান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটি শুধু ডিপ্লোমাধারীদের জন্য বরাদ্দ করে দেওয়াটা অন্যায়। সিপিডি-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকৌশলীদের মধ্যে আজকের এই অবস্থার মূল কারণ হলো যথাযথ দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে সরকারি চাকরির শর্টকাট পথ খোঁজা।
খবরওয়ালা/টিএসএন



