খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে ভাদ্র ১৪৩২ | ২৮ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে দেশীয় প্রেস মালিকদের ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিকের বই ছাপানোর দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ লক্ষ্যে ক্রয় সংক্রান্ত বিধিতে সময়সীমা শিথিল করেছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন দেশীয় প্রেস ও পেপার মালিকরা। তাঁদের অভিযোগ, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের মুদ্রণ শিল্প ধসে পড়বে, কর্মসংস্থান হারাবে কয়েক লাখ মানুষ এবং ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮–এর ৮৩(১)(ক) ধারা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক দরপত্রে দরপত্র প্রস্তুত ও জমার জন্য কমপক্ষে ৪২ দিন সময় দেওয়ার নিয়ম ছিল। তবে মঙ্গলবার ক্রয় কমিটি সংশোধনী এনে সময়সীমা কমিয়ে ১৫ দিন করেছে।
দেশীয় মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা বলেন, বাংলাদেশি প্রেস মালিকরা প্রতি টন কাগজ কিনছেন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায়, অথচ চীনে দাম ৭৭–৮০ হাজার টাকা। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক কম দরে বই ছাপাতে পারবে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারবে না।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকের ৯ কোটি বই ছাপার কেনাকাটার প্রস্তাব অনুমোদন করা হলেও আটকে দেওয়া হয়েছে মাধ্যমিকের ২১ কোটি বই কেনাকাটার প্রস্তাব। গত ১৯ আগস্ট ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ১১ কোটি ৮৯ লাখ ৩২ হাজার ৮০২ কপি বই ছাপানোর জন্য তিনটি প্রস্তাব ক্রয় কমিটিতে উত্থাপন হয়, যার মোট ব্যয় ধরা হয় ৬০৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নানা অভিযোগ তুলে সেটি অনুমোদন দেয়নি কমিটি।
এর আগে বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে নানা বিতর্ক দেখা দেয়। এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছর দেশীয় প্রেস মালিকরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা বা সিন্ডিকেট করে দরপত্র দেওয়ায় সরকারের ৩২৩ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। গত বছর নিম্নমানের বই দিয়েছে অন্তত ৪০টি প্রেস। এর আগের বছরগুলোয় একইভাবে নিম্নমানের বই দিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ভর্ৎসনার শিকার হয় দেশীয় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। শুধু তাই নয়, বইয়ের মান মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেকশন এজেন্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিম্নমানের বইকে ভালোমানের বই বলে সত্যায়ন করে এজেন্সিগুলো। এ ছাড়া সরকারের ক্রয় কমিটির কাছে অভিযোগ ছিল, চলতি বছর ৩০ কোটির বেশি বইয়ের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কাজ যাচ্ছে আওয়ামীপন্থি প্রেস মালিকদের কাছে। বিশেষ করে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ছোট ভাই জুলাই আন্দোলনে হত্যা মামলার আসামি রব্বানী জব্বারের মালিকানাধীন আনন্দ প্রিন্টার্স ও এপেক্স প্রিন্টার্স তিন শ্রেণিতে ১৬টি লটে ৭২ লাখ বইয়ের কাজ পাওয়ায় আপত্তি তোলা হয়। সাবেক একজন মন্ত্রীর ভাই এ সময়ে কীভাবে কাজ পায়, সেই প্রশ্ন তুলে বিষয়টি শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে জানতে চান কমিটির অন্য সদস্যরা। এ ছাড়া ২২৭টি লটের বিপরীতে ৯টি প্যাকেজ করায় আপত্তি তোলে টেকনিক্যাল কমিটি। এত অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেই গত ২৬ আগস্ট ক্রয় কমিটি পিপিআর ৮৩(১)(ক) বিধিতে সংশোধনী আনে।
জানা গেছে, এরই মধ্যে দুই ভাগে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ১৯০টি লটে ৭ কোটি ৬৭ লাখ বই ছাপার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ক্রয় কমিটি। এতে মোট ব্যয় হবে ৩৮৮ কোটি ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৮৮ টাকা। ক্রয় কমিটি থেকে ফেরত আসা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে মোট লট ছিল ২৭০টি। এর মধ্যে বইয়ের সংখ্যা ছিল ১১ কোটি ৮৯ লাখ। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ৬০৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে মাদ্রাসা পর্যায়ের ইবতেদায়ির ৫০টি লটের দরপত্র মূল্যায়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে এনসিটিবি। নবম-দশম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি লট। এ দুই শ্রেণিতে ২৩৪টি লটের দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন যখন প্রায় শেষ, ঠিক এ সময়ে এসে দরপত্র বাতিল করায় এনসিটিবির কর্তা-ব্যক্তিরা বলছেন, এখন ফের দরপত্র দিয়ে জানুয়ারির মধ্যে বই দেওয়া অনেকটা কঠিন। তবে প্রাথমিকের বই ছাপানোর অনুমোদন হয়ে যাওয়ায় মাধ্যমিকের বই ছাপাতে চাপ কিছুটা কমবে। তবে সরকার যেহেতু দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা কমিয়েছে, এর সঙ্গে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অন্যান্য ধাপ দ্রুত সময়ে শেষ করা গেলে ডিসেম্বরের মধ্যে বই দেওয়া সম্ভব।
জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী বুধবার বলেন, সরকার মাধ্যমিকে বইয়ের দরপত্র বাতিল করেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা অফিসিয়ালি জানি না, তবে শুনেছি। এখন সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত দেবে, সেভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, দরপত্র জমার সময়সীমা ১৫ দিন করা হয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে মূল্যায়নসহ অন্যান্য কাজ দ্রুত শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যে সব বই দেওয়া এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের এক্সপোর্ট অ্যান্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ খাতে পেপার মিলগুলোর বিনিয়োগ ৭০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রেস মালিকদের বিনিয়োগ ২০ হাজার কোটি টাকা। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। আন্তর্জাতিক দরপত্র হলে এ শিল্প ধ্বংস হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী বলেন, জানুয়ারির মধ্যে বই সরবরাহের লক্ষ্যে দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড