খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল ও ঐতিহ্যবাহী দল হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে আসন্ন বিশ্বকাপে জার্মানি অধিকাংশ ফুটবল বিশ্লেষক ও ভক্তদের ফেবারিট তালিকায় শীর্ষস্থানে নেই। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী সোনালী প্রজন্মের বিদায়ের পর দলটি বর্তমানে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিগত দুই বিশ্বকাপে (২০১৮ ও ২০২২) গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার ফলে অনেকের চোখেই জার্মানি তার পূর্বের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য ও ভয়ংকর রূপ হারিয়েছে। তবে ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাস ও দলটির কাঠামোগত গভীরতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জার্মানিকে শুধু সাম্প্রতিক ফর্ম বা কাগুজে সমীকরণ দিয়ে বিচার করা এবং বড় মঞ্চে তাদের অবমূল্যায়ন করা সব সময়ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান জার্মান জাতীয় দলটিতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি উদীয়মান ও প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের একটি চমৎকার সমন্বয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের মধ্যে জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্টজ, কাই হাভার্টজ, ডেনিজ উনদাভ এবং আলেক্সান্দার পাভলোভিচের মতো তরুণরা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। এই তরুণ ফুটবলারদের খেলার মূল বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ গতি, আক্রমণাত্মক সৃজনশীলতা এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেলে ধরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
তরুণদের এই গতিশীলতার পাশাপাশি দলে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখছেন জশুয়া কিমিখ ও ম্যানুয়েল নয়্যারের মতো বিশ্বখ্যাত অভিজ্ঞ ফুটবলাররা। গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ ম্যানুয়েল নয়্যারের শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি পুরো রক্ষণভাগকে আত্মবিশ্বাস জোগায়। অন্যদিকে, মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগে জশুয়া কিমিখের মাঠের নেতৃত্ব, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং লড়াকু মানসিকতা দলটিকে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সংগঠিত রাখতে সহায়তা করে। জার্মান ফুটবলের চিরন্তন শক্তি হলো তারা কখনোই একক কোনো তারকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়; বরং দলগত শৃঙ্খলা, নিখুঁত কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানসিক দৃঢ়তাই তাদের মূল হাতিয়ার।
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় জার্মানির আন্ডারডগ হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একাধিক অনন্য নজির রয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের চার মহান কিংবদন্তি—ফেরেঙ্ক পুসকাস, ইয়োহান ক্রইফ, ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসির দলকে ফাইনালে পরাজিত করেই জার্মানি তাদের চারটি শিরোপা অর্জন করেছে।
১. ১৯৫৪ বিশ্বকাপ (Miracle of Bern): সেই আসরের অবিসংবাদিত ফেবারিট এবং টানা ৩২ ম্যাচে অপরাজিত থাকা ফেরেঙ্ক পুসকাসের শক্তিশালী হাঙ্গেরিকে ফাইনালে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে পশ্চিম জার্মানি।
২. ১৯৭৪ বিশ্বকাপ: ইয়োহান ক্রইফের বিশ্ব কাঁপানো ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনের নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় তারা।
৩. ১৯৯০ বিশ্বকাপ: ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বাধীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলে জার্মানি।
৪. ২০১৪ বিশ্বকাপ: লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো ট্রফি জেতে তারা। এই আসরের সেমিফাইনালে আয়োজক ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
নিচে জার্মানির ফুটবল ইতিহাসের ঐতিহাসিক চার শিরোপা জয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং সাম্প্রতিক দুই আসরের ব্যর্থতার খতিয়ান একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিশ্বকাপের সাল | প্রতিপক্ষ দল ও প্রধান তারকা | ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল ও গুরুত্ব | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট |
| ১৯৫৪ | হাঙ্গেরি (ফেরেঙ্ক পুসকাস) | ৩-২ ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানি জয়ী | আন্ডারডগ হিসেবে ঐতিহাসিক ‘মিরাকল অব বার্ন’ জয়। |
| ১৯৭৪ | নেদারল্যান্ডস (ইয়োহান ক্রইফ) | ২-১ ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানি জয়ী | ডাচদের বিখ্যাত ‘টোটাল ফুটবল’ কৌশল নস্যাৎ। |
| ১৯৯০ | আর্জেন্টিনা (ডিয়েগো ম্যারাডোনা) | ১-০ ব্যবধানে জার্মানি জয়ী | ইতালির মাটিতে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয়। |
| ২০১৪ | আর্জেন্টিনা (লিওনেল মেসি) | ১-০ ব্যবধানে (অতিরিক্ত সময়ে) জার্মানি জয়ী | সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর পর শিরোপা জয়। |
| ২০১৮ | গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষসমূহ | গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় | ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রথম পর্বেই টুর্নামেন্ট সমাপ্তি। |
| ২০২২ | গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষসমূহ | গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় | টানা দ্বিতীয়বারের মতো নকআউট পর্বে উঠতে ব্যর্থতা। |
বিগত দুই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার নেতিবাচক রেকর্ড জার্মানির নামের পাশে রয়েছে। আর এই সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণেই আসন্ন আসরে দলটিকে ঘিরে সাধারণ দর্শক ও গণমাধ্যমের প্রত্যাশার চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে ক্রীড়া মনস্তত্ত্বের পরিভাষায়, এই কম প্রত্যাশা অনেক সময় জার্মানির মতো বড় দলের জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করে। লাইমলাইট বা অতিরিক্ত চাপমুক্ত থেকে নিজেদের কৌশলগত উন্নতিতে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা।
চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানো, দলগত সংহতি প্রদর্শন এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়া—এটাই জার্মান ফুটবলের প্রধান ঐতিহ্যগত পরিচয়। ফলস্বরূপ, বর্তমান দলটি হয়তো স্পষ্ট বা এক নম্বর ফেবারিট হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করছে না, কিন্তু তাদের স্কোয়াডের গভীরতা এবং ঐতিহাসিক ডিএনএ-র কারণে তারা যেকোনো পরাশক্তির জন্যই অত্যন্ত বিপজ্জনক এক ‘আন্ডারডগ’।