খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
নাটোর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের লালবাজার মহল্লায় একটি বন্য বানরের ক্রমাগত আক্রমণ থেকে সুরক্ষার দাবিতে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) শরণাপন্ন হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে লালবাজার এলাকার শতাধিক ভুক্তভোগী বাসিন্দার পক্ষে মিলন আখন্দ নামের এক ব্যক্তি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি লিখিত দরখাস্ত জমা দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত তিন মাসে এই বানরটির কামড় ও খামচিতে এলাকার অন্তত ৩২ জন মানুষ কম-বেশি আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ জনকে সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী প্রতিষেধক বা টিকা নিতে হয়েছে।
লিখিত দরখাস্ত এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক তিন মাস আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো এলাকা থেকে একটি পুরুষ প্রকৃতির ‘খ্যাপা’ বানর এসে লালবাজার মহল্লাটিতে আস্তানা গেড়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত বানরটি মহল্লার বিভিন্ন রাস্তাঘাট, ঘরের ছাদ ও গাছে ঘুরে বেড়ায়। শুধু বাইরেই নয়, এটি মানুষের বসতবাড়ির রান্নাঘর, ভেতরের খাবার টেবিল, মহল্লার মিষ্টি ও খাবারের হোটেল এবং বিভিন্ন মুদি দোকানে অনধিকার প্রবেশ করে খাবার ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি মানুষের ওপর অতর্কিত আক্রমণও চালাচ্ছে। বানরটির এই হিংস্র আচরণের কারণে মহল্লাবাসী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে সারাক্ষণ নিজেদের ঘরের জানালা ও দরজা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
আক্রমণের শিকার লালবাজারের ৩২ বছর বয়সী বাসিন্দা কাকলী রায় নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে জানান, আনুমানিক দুই মাস আগে তিনি একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বানরটি হঠাৎ লাফ দিয়ে তাঁর হাতে কামড় বসায়। এই কামড়ের তীব্রতায় তাঁর একটি আঙুলের অভ্যন্তরীণ রগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শল্যচিকিৎসার (অপারেশন) মাধ্যমে সেই রগ জোড়া দেওয়া হলেও তিনি এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি এবং নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
নাটোর সদর হাসপাতালের ভ্যাকসিন (টিকা) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফ নার্স পারভিন আক্তার লালবাজারে বানরের আক্রমণের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, হাসপাতালটিতে মাঝেমধ্যেই বানরের আক্রমণের শিকার হয়ে রোগীরা চিকিৎসার জন্য আসছেন। সরকারি হিসাব মতে, গত তিন মাসে হাসপাতাল থেকে মোট ১৫ জন রোগীকে এই কারণে প্রতিষেধক বা টিকা প্রদান করা হয়েছে। এর বাইরেও আক্রান্ত অনেক রোগী নিজস্ব উদ্যোগে বেসরকারি বা বাইরের ফার্মেসি থেকে টিকা গ্রহণ করছেন।
অন্যদিকে, লালবাজারের এই বানরটি সাধারণ বানরের চেয়ে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক আচরণ করছে বলে নিশ্চিত করেছেন বন বিভাগের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান যে, বন বিভাগের কর্মীরা বারবার চেষ্টা করেও চতুর ও ক্ষ্যাপা বানরটিকে খাঁচাবন্দি বা আটক করতে পারেননি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁরা এখন ট্রাঙ্কুলাইজার বা চেতনানাশক ব্যবহারের মতো বিকল্প ব্যবস্থার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছেন।
আবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবুল হায়াত জানান, ভুক্তভোগী মহল্লাবাসীর লিখিত দরখাস্তটি তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন। এই বন্য প্রাণীর উপদ্রব থেকে দ্রুত স্থায়ী মুক্তি পেতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে অতিসত্বর প্রয়োজনীয় ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
লালবাজার মহল্লায় বানরের আক্রমণ ও বর্তমান চিকিৎসাগত পরিস্থিতির একটি পরিসংখ্যানগত উপাত্ত নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক ও স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত |
| আক্রান্ত এলাকার অবস্থান | লালবাজার মহল্লা, ২ নম্বর ওয়ার্ড, নাটোর পৌরসভা |
| আবেদনের ধরণ ও তারিখ | জেলা প্রশাসকের নিকট শতাধিক বাসিন্দার লিখিত দরখাস্ত (৪ জুন) |
| আবেদনের মূল দাবি | অস্বাভাবিক আচরণ করা বানরের উপদ্রব থেকে স্থায়ী সুরক্ষা |
| সর্বমোট আহত বাসিন্দার সংখ্যা | অন্তত ৩২ জন (বিগত ৩ মাসে) |
| হাসপাতালে নিবন্ধিত টিকা গ্রহীতা | ১৫ জন (তথ্যসূত্র: নাটোর সদর হাসপাতাল ভ্যাকসিন শাখা) |
| গুরুতর আহত ভুক্তভোগী | কাকলী রায় (৩২), আঙুলের রগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অপারেশন সমাপন |
| বন বিভাগের প্রাথমিক পদক্ষেপ | একাধিকবার ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া ও বিকল্প ব্যবস্থার পরিকল্পনা |
| প্রশাসনিক আশ্বাস | বন বিভাগের সাথে যৌথ আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ |
লালবাজারের বাসিন্দারা এখন জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বন্য প্রাণীর উপদ্রব থেকে মুক্তি পেয়ে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।