খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ করানোর (পুশ ইন) প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে জেলার প্রায় ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকাজুড়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে মাইকিং ও উঠান বৈঠকসহ নানা সতর্কতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। আজ রোববার পর্যন্ত হবিগঞ্জ জেলার কোনো সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি বলে বিজিবি দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করেছে।
হবিগঞ্জ সীমান্তে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি ঠেকাতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি বেশ কিছু সময়োপযোগী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার গভীর রাতে সীমান্তবর্তী গ্রাম ও জনপদগুলোতে বিজিবির ৫৫ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়। এর পাশাপাশি দিনের বেলায় নিয়মিত উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার স্থানীয় সাধারণ জনগণকে পুশ ইনের সম্ভাব্য ঝুঁকি, সীমান্তে যেকোনো ধরণের সন্দেহজনক তৎপরতা শনাক্তকরণ এবং এই সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য অতি দ্রুত বিজিবিকে জানানোর বিষয়ে বিস্তারিত সচেতন করা হচ্ছে।
এই জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সীমান্তবর্তী সাধারণ বাসিন্দাদের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রাম পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপির (Ansar-VDP) সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। বিজিবির এই সমন্বিত উদ্যোগে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী গুইবিল এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় ভ্যানচালক মো. মজনু মিয়া জানান, রাতের বেলা মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্ক করার ফলে সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। বিজিবির এই নিয়মিত ও নিবিড় পাহারার কারণে তারা এখন নিজেদের বেশ নিরাপদ বোধ করছেন।
একইভাবে মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া এলাকার চা-বাগানের কর্মী মোহন লাল বলেন, বিজিবির উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ পুশ ইন বা অনুপ্রবেশের মতো জটিল বিষয়টি খুব সহজে বুঝতে পেরেছে। এর ফলে সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের পক্ষে যেকোনো সন্দেহজনক অপরিচিত ব্যক্তিকে চেনা এবং সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করার পথ সুগম হয়েছে।
হবিগঞ্জ বিজিবির ৫৫ ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, মাইকিং ও প্রচার কার্যক্রমের এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় জনসাধারণের সার্বিক সহযোগিতায় ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ বিজিবির ৫৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানান, পরিবর্তিত ও বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা (হাই অ্যালার্ট) জারি করা হয়েছে। প্রতিটি বর্ডার অবজারভেশন পোস্টে (বিওপি) বিজিবির সশস্ত্র টহল জোরদার করার পাশাপাশি নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে সীমান্তের প্রতিটি সুনির্দিষ্ট অংশকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে রাত্রিকালীন সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে কেউ যেন অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন ব্যবহার করে আকাশপথে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিচে হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচালিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সীমান্ত নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের খাতসমূহ | বিজিবি কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ ও পরিসংখ্যানগত তথ্য |
| সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ন | হবিগঞ্জ ৫৫ ব্যাটালিয়ন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) |
| নজরদারির আওতাধীন সীমান্ত দৈর্ঘ্য | প্রায় ১০৩ কিলোমিটার |
| নিরাপত্তা প্রহরা ও টহলের সময়কাল | ২৪ ঘণ্টা (দিন ও রাত সার্বক্ষণিক) |
| রাত্রিকালীন বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার | থার্মাল এবং ইনফ্রারেড ড্রোন (Thermal & Infrared Drone) |
| মাঠপর্যায়ের সতর্কতামূলক কর্মসূচি | সীমান্তবর্তী এলাকায় মাইকিং ও নিয়মিত উঠান বৈঠক |
| যৌথ কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ | স্থানীয় বাসিন্দা, গ্রাম পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপি সদস্য |
| সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য | পুশ ইনের ঝুঁকি ও সন্দেহজনক তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান |
| অনুপ্রবেশের বর্তমান পরিসংখ্যান | আজ রোববার পর্যন্ত কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি (শূন্য) |
| উল্লেখযোগ্য সীমান্তবর্তী এলাকা | গুইবিল (চুনারুঘাট) এবং তেলিয়াপাড়া (মাধবপুর) |
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় সীমান্তবর্তী জনগণের এই যৌথ প্রতিরোধমূলক অবস্থানের কারণে হবিগঞ্জ জেলার ১০৩ কিলোমিটার সীমান্ত বর্তমানে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিশ্ছিদ্র রয়েছে।