নওগাঁর ধামইরহাটে বিয়ের কথা বলে মেরিনা বেগম নামের এক নারীকে ডেকে নিয়ে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে পরিচয় গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন ও তারেক নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় আরও দুজনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁদের ধরতে অভিযান চলছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় ধামইরহাটের ভলকাডাঙ্গা এলাকার একটি আমবাগানে এক নারীর পোড়া মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। ওই সময় প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। মরদেহের কাছ থেকে একটি জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রসাধনসামগ্রীসহ কয়েকটি জিনিস পাওয়া যায়।
এরই মধ্যে মেরিনা বেগম নিখোঁজ হয়েছেন জানিয়ে তাঁর ছেলে কাউসার আলী ধামইরহাট থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে আসেন। পরে পুলিশ তাঁকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেলে সেখানে পাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও মরদেহ দেখে তিনি তাঁর মাকে শনাক্ত করেন। এরপর ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাবুল হোসেন ও তারেকের নাম সন্দেহভাজন হিসেবে সামনে আসে। পরে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার জানান, দুধ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে মেরিনার সঙ্গে বাবুল হোসেনের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং নিয়মিত মুঠোফোনে যোগাযোগ চলত। পরে মেরিনা বাবুলকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন বলে পুলিশের কাছে দাবি করেন বাবুল। এমনকি বিয়ে না হলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও তিনি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবুল মেরিনাকে ১৬ আগস্ট বিয়ে করার কথা জানান। সেই আশ্বাস বিশ্বাস করে মেরিনা নতুন পোশাক, জুতা ও প্রসাধনসামগ্রী কেনেন। সঙ্গে নেন জাতীয় পরিচয়পত্রও। বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েই তিনি বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট দুপুরে মেরিনা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর বাবুলের নির্দেশে তারেকসহ কয়েকজন তাঁকে নিতে শাহাপুর ইউনিয়নের দিকে যায়। সেখান থেকে তাঁকে অগ্রাদিগুণ বাজারে নেওয়া হয়। পরে রাতের দিকে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় করে মনিহারি-তালপুকুর সড়কের পাশে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দূরে ভলকাডাঙ্গা এলাকার আমবাগানে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, আমবাগানে নেওয়ার পর বাবুলের নির্দেশে তারেকসহ দুজন মেরিনার গলায় বেল্ট পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। এতে একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর মরদেহের ওপর খড়কুটো জড়ো করা হয়। পরে বাবুল শরীরে পেট্রল ঢেলে গ্যাসলাইট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মরদেহে আগুন দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পরিচয় গোপন করা—প্রাথমিক তদন্তে এমনটাই ধারণা করছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সম্পর্কের বিরোধ ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মেরিনার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে কাউসার আলী ও স্বামী হাসেন আলী জীবিকার প্রয়োজনে কুমিল্লায় থাকেন। গত ১৪ আগস্ট মেরিনা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন। পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পাওয়া তথ্য যাচাই করে ঘটনার পুরো চিত্র স্পষ্ট করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে আরও দুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিয়ের আশ্বাস দিয়ে একজন নারীকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

