গাজীপুরের শ্রীপুরে পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের এক কলেজছাত্রীকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রিজভীর বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই ছাত্রীকে কলেজে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করতেন রিজভী। পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও ছাত্রীটির পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। এর পরপরই ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে রিজভীকে বহিষ্কার করেছে গাজীপুর জেলা ছাত্রদল। একই সঙ্গে পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অপহরণের অভিযোগের বিষয়ে রিজভীর বক্তব্য জানা যায়নি। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত রিজভীর বয়স ২৪ বছর। তিনি শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের সিংগারদিঘী গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে। এ ঘটনায় রিজভী, তাঁর বাবা মনির হোসেন ও মা নিলুফা আক্তারের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন কলেজছাত্রীর পরিবারের সদস্যরা।
দীর্ঘদিন উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ
পরিবারের করা লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ওই ছাত্রীকে কলেজে যাওয়া ও ফেরার পথে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন রিজভী। বিষয়টি একপর্যায়ে ছাত্রীটি পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে রিজভীকে এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করা হয়।
কিন্তু সতর্ক করার পরও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে রিজভীর বাবা-মাকেও বিষয়টি জানানো হয়। পরিবারের দাবি, ছেলেকে শাসন করার বদলে রিজভীর বাবা-মা ওই ছাত্রীর পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান।
তবে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ছাত্রীর পরিবার। এরপর থেকেই রিজভী ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দোকানের সামনে থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে বাসার সামনে একটি দোকানে কেনাকাটা করতে যান ওই কলেজছাত্রী। তখন সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে রিজভী অবস্থান করছিলেন।
ছাত্রী দোকানের সামনে পৌঁছালে তাঁকে টানাহেঁচড়া করে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। এরপর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে বিষয়টি জানান। পরে তাঁকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে পুলিশ।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটি অপহরণ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ওই কলেজছাত্রীকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ঘটনার সময় কারা উপস্থিত ছিল এবং অপহরণের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগের পর ছাত্রদলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর রিজভীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় গাজীপুর জেলা ছাত্রদল। জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক সরকার মো. রাকিব হোসেনের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তাঁকে পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।
গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সোহাগ হোসেন জানান, রিজভীর বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠায় তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগটি ঘিরে সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে দলীয় বহিষ্কার কোনো ফৌজদারি মামলার বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়; অভিযোগের আইনগত সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া।
এখনো উদ্ধার হয়নি কলেজছাত্রী
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর কলেজছাত্রীর স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। মাওনা পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, স্বজনদের দেখানো কয়েকটি বাড়িতে অভিযান চালানো হলেও ওই কলেজছাত্রীকে তখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিনুর আলম জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কলেজছাত্রীকে উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার পর কলেজছাত্রীর পরিবার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে মো. রিজভীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পুরো ঘটনার প্রকৃত কারণ, কলেজছাত্রীকে কোথায় নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর পুলিশের তদন্ত শেষ হলে আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত রিজভীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই রয়েছে; আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।


