খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে মাঘ ১৪৩২ | ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কে কে যাবি আয় রে চল যাই রে ,শব্দসৈনিক ও সঙ্গীতশিল্পী
ইন্দ্রমোহন রাজবংশী
ইন্দ্রমোহন রাজবংশী—একটি কণ্ঠ, একটি সংগ্রাম, একটি সময়।
তিনি একাধারে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সঙ্গীতশিল্পী, লোকগান সংগ্রাহক এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। তাঁর কণ্ঠে গান শুধু সুর ছিল না—ছিল সাহস, প্রত্যয় আর মুক্তির ডাক।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর গাওয়া গান রণাঙ্গনের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অস্ত্রের পাশাপাশি কণ্ঠ যে যুদ্ধের শক্তিশালী হাতিয়ার—ইন্দ্রমোহন রাজবংশী তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
জন্ম: ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৬
জন্মস্থান: ঢাকা
সংগীত ছিল তাঁর রক্তের উত্তরাধিকার। তাঁর পরিবারের পাঁচ পুরুষ সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন সঙ্গীত কলেজে লোকসঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ছিলেন বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা—লোকসংগীত সংরক্ষণ ও বিকাশে যার অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৫৭ সালে বেতারের ছোটদের আসর-এ গান করার মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু।
১৯৬৭ সালে ‘চেনা অচেনা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তাঁর।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের প্রয়াসে জীবনঝুঁকি নিয়ে কিছুদিন নাম-পরিচয় গোপন রেখে পাকিস্তানিদের দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। পরে সেই বিপজ্জনক অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে—যেখানে তাঁর গান হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ভাষা।
ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, জারি, সারি, মুর্শিদি—লোকসংগীতের প্রায় সব ধারাতেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। একই সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবেও তিনি নিজস্ব মর্যাদা অর্জন করেন।
চলচ্চিত্র, বেতার ও টেলিভিশনে তিনি গেয়েছেন অসংখ্য গান।
গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি আজীবন কাজ করেছেন লোকগান সংগ্রহে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে সহস্রাধিক কবির লেখা কয়েক লাখ গান সংগ্রহ করেন—যা বাংলা লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ভাণ্ডার।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
ব্যক্তিজীবনে তাঁর স্ত্রী দীপ্তি রাজবংশী এবং পুত্র রবীন রাজবংশীও লোকগানের সঙ্গে সম্পৃক্ত—যেন সুরের উত্তরাধিকার এখনও বহমান।
এই দেশবরেণ্য কণ্ঠযোদ্ধা ৭ এপ্রিল ২০২১ সালে আমাদের ছেড়ে চলে যান।
কিন্তু তাঁর গান, সংগ্রহ ও সংগ্রাম—আজও বেঁচে আছে বাংলার মানুষের কণ্ঠে ও স্মৃতিতে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।