এক নক্ষত্রের নিভে যাওয়া, রেখে যাওয়া অমীমাংসিত প্রশ্ন
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ থেমে যায় না। তাঁদের লেখা, চিন্তা, প্রশ্ন আর সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা সময়ের দেয়াল পেরিয়ে বারবার ফিরে আসে। সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার তেমনই এক নির্ভীক কলমসৈনিক—যাঁর জীবন ছিল সাংবাদিকতার প্রতি একনিষ্ঠতা, রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে পাঠ করার নিরন্তর প্রয়াস এবং সত্য অনুসন্ধানের এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।
১৯৫৪ সালের ৬ জুন উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁর ভেতরে ছিল সমাজ ও সময়কে জানার এক অদম্য কৌতূহল। ষাটের দশকের শেষভাগে স্কুলছাত্র থাকতেই দৈনিক আজাদ-এর মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি। সেই বয়সেই হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম—আর সেই কলমই পরবর্তী জীবনে হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
ছাত্রজীবনেই তিনি যুক্ত হন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দিনাজপুর জেলা কমিটির সহসভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতি তাঁর কাছে নিছক ক্ষমতার হিসাব ছিল না; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষ ও সময়কে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা ছিল।
বোদা পাইলট হাই স্কুলের পাঠ শেষে দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ১৯৭৩ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থাতেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। সাপ্তাহিক জয়ধ্বনি, একতা, যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক রূপালীসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন। পাশাপাশি সম্পাদনা করেছেন সাপ্তাহিক চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ।
দৈনিক মাতৃভূমি-তে তাঁর সম্পাদনায় আমি নওগাঁর রানীনগর উপজেলা মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই স্মৃতি আজও আমার কাছে অমূল্য। একজন সম্পাদক হিসেবে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সংবাদবোধ এবং লেখার প্রতি যত্ন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সংবাদকে তিনি শুধু খবর হিসেবে দেখতেন না—খবরের অন্তরালে থাকা মানুষ, সমাজ ও সময়কেও পাঠ করতেন।
আশির দশকের মধ্যভাগে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন প্রকাশিত হলে ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে প্রকাশিত তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। তাঁর লেখায় ছিল তথ্য, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি ছিলেন এমন একজন কলামিস্ট, যিনি কেবল ঘটনাকে বর্ণনা করতেন না—ঘটনার ভেতরের ঘটনা পাঠকের সামনে উন্মোচন করার চেষ্টা করতেন।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি লিখেছেন অসংখ্য বিশ্লেষণধর্মী কলাম। তাঁর কলম ছুটেছে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের পাতায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লিখেছেন দেশের প্রথম অনলাইন দৈনিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ। পাশাপাশি তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক বর্তমানে।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যাও দশের অধিক। ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ—‘বঙ্গবন্ধুঃ ইতিহাসের নির্মাতা’ এবং ‘শেখ হাসিনাঃ স্বপ্ন পূরণের সফল কারিগর’। তাঁর লেখালেখির বিস্তৃত পরিসরই প্রমাণ করে, সাংবাদিকতার পাশাপাশি ইতিহাস, রাজনীতি ও সমকালীন বাংলাদেশকে তিনি গভীর মনোযোগে পাঠ করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মাধ্যমে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। একজন সাংবাদিকের কাছে সময়ের সত্যকে ধরে রাখা যেমন দায়িত্ব, বিভুরঞ্জন সরকার সেই দায়িত্বকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বহন করেছেন।
কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি আজও এক গভীর অন্ধকারে ঢাকা।
২১ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশে বের হন। তারপর আর তিনি ফিরে আসেননি। পরদিন, ২২ আগস্ট, পুলিশ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মেঘনা নদীতে ভাসমান অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের এমন রহস্যজনক মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেয়। কী ঘটেছিল সেদিন? কোথায়, কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো? কেনই বা তাঁর শেষ যাত্রার পথ গিয়ে মিশল মেঘনার বিস্তীর্ণ জলরাশিতে?
সময় পেরিয়েছে। স্মৃতি পুরোনো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নগুলো পুরোনো হয়নি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নগুলো আরও ভারী হয়েছে—আরও নীরব, আরও বিষণ্ন।
বিভুরঞ্জন সরকার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর লেখা আছে, তাঁর কলমের দাগ আছে, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের স্মৃতি আছে, আছে সহকর্মীদের হৃদয়ে তাঁর অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর রেখে যাওয়া সত্যনিষ্ঠ শব্দ—আর সেই উত্তরাধিকারেই তিনি বেঁচে থাকবেন।
কোনো কোনো মৃত্যু একটি মানুষের জীবনকে থামিয়ে দেয়, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নকে থামাতে পারে না।
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুও তেমনই—
একটি রহস্যঘেরা প্রস্থান,
একগুচ্ছ অমীমাংসিত প্রশ্ন,
আর একজন সত্যসন্ধানী সাংবাদিকের অনন্ত স্মৃতি।
আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই নির্ভীক কলমযোদ্ধাকে।
তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
বিভুরঞ্জন সরকার—আপনি নেই, কিন্তু আপনার লেখা আছে।
আপনার কলমের অক্ষরে, আপনার প্রশ্নের ভেতরে,
আর আমাদের স্মৃতির গভীরতম অন্ধকারে জ্বলে থাকা এক অনির্বাণ আলো হয়ে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


