স্মরণে -সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ

“জঙ্গল শুধু গাছপালা নয়,
জঙ্গল মানুষেরও একটি গভীর অন্তর্জগৎ।”

বাংলা কথাসাহিত্যে প্রকৃতি, অরণ্য, মানুষ ও মানুষের অন্তর্লোককে এক অপূর্ব মায়াময় ভাষায় তুলে ধরেছিলেন যে কজন কথাশিল্পী, বুদ্ধদেব গুহ তাঁদের অন্যতম। তাঁর লেখায় অরণ্য শুধু পটভূমি নয়—অরণ্য যেন নিজেই একটি জীবন্ত চরিত্র; নদী, পাহাড়, গাছপালা, পশুপাখি আর নিসর্গের সঙ্গে সেখানে মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ ও অস্তিত্বের গল্প মিশে থাকে।

বুদ্ধদেব গুহ জন্মগ্রহণ করেন ২৯ জুন ১৯৩৬ সালে কলকাতায়। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে রংপুর ও বরিশালের সঙ্গে তাঁর স্মৃতির গভীর সম্পর্ক ছিল। ফলে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি তাঁর এক বিশেষ টান ছিল আজীবন।

পড়াশোনা করেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অর্থনীতি ও হিসাবের কঠিন জগতের পাশাপাশি তাঁর ভেতরে বাস করত প্রকৃতিপ্রেমী এক স্বপ্নময় মানুষ—যে মানুষটি সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন বন, অরণ্য, পাহাড় আর নির্জন প্রকৃতির কাছে।

তাঁর জীবন ছিল বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের বহু দেশ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, হাওয়াই, জাপান, থাইল্যান্ড এবং পূর্ব আফ্রিকার নানা অঞ্চল তিনি ভ্রমণ করেছেন। তবে পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেও পূর্ব ভারতের বন-জঙ্গলই যেন তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে আপন ঠিকানা হয়ে ছিল।

বন, পশুপাখি, নদী, পাহাড় এবং অরণ্যবাসী মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল দীর্ঘদিনের নিবিড় পরিচয়। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে স্বতন্ত্র রং ও গন্ধ।

সাহিত্যে প্রবেশ

বুদ্ধদেব গুহের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘জঙ্গলমহল’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর অসংখ্য উপন্যাস, গল্প ও ভ্রমণকাহিনি।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে—
*‘মাধুকরী’, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘বাবলি’, ‘কুমুদিনী’, ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’, ‘হলুদ বসন্ত’, ‘একটু উষ্ণতার জন্য’, ‘চরাবাড়ি’, ‘কোজাগর’, ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’*সহ আরও বহু গ্রন্থ।

তাঁর সাহিত্যজগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিগুলোর একটি ঋজুদা। শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত এই অভিযাত্রিক চরিত্রটি শুধু ছোটদের নয়, বড়দের কাছেও সমান জনপ্রিয়। ঋজুদার চোখ দিয়ে পাঠক আবিষ্কার করে অরণ্যের রহস্য, বন্যপ্রাণীর জীবন, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের নানা অজানা জগত।

‘মাধুকরী’—এক অন্য বুদ্ধদেব

বুদ্ধদেব গুহের বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘মাধুকরী’ বাংলা সাহিত্যে তাঁকে এক বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। মানুষের প্রচলিত জীবনধারা, সম্পর্ক, প্রেম, সমাজ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাস পাঠকের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—মানুষকে তিনি কেবল সামাজিক পরিচয়ে দেখেননি; দেখেছেন তার আকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা, স্বপ্ন, একাকিত্ব ও অন্তর্গত দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে।

তাই তাঁর উপন্যাসে প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষও হয়ে ওঠে এক গভীর রহস্য।

প্রকৃতিই তাঁর সাহিত্যের প্রাণ

বুদ্ধদেব গুহ বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য শুধু মস্তিষ্কের বিষয় নয়—সাহিত্যে হৃদয়ের ভূমিকা অনেক বড়।

এই বিশ্বাস তাঁর লেখার প্রতিটি পৃষ্ঠায় যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শাল-পিয়ালের বন, পাহাড়ি পথ, নদীর জল, অন্ধকার রাত, জোনাকির আলো, হরিণের ছুটে চলা কিংবা দূর অরণ্য থেকে ভেসে আসা অচেনা পাখির ডাক—তাঁর কলমে এসব নিছক প্রকৃতির বর্ণনা হয়ে থাকেনি; বরং পাঠকের অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছে।

তাঁর লেখা পড়তে পড়তে মনে হয়—
বইয়ের পাতা নয়, যেন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
দূরে কোথাও পাখি ডাকছে,
পাতার আড়ালে হরিণ দাঁড়িয়ে,
আর সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে গাছের মাথায়।

শুধু লেখক নন, ছিলেন সুকণ্ঠ শিল্পীও

বুদ্ধদেব গুহের আরেকটি পরিচয় অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। তিনি ছিলেন সুকণ্ঠ রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী। একসময় নিয়মিত গান গাইতেন। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি পুরাতনী টপ্পা গানেও তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।

তাঁর স্ত্রী ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ঋতু গুহ। সংগীত ও সাহিত্যের এই দুই জগতের সুন্দর মিলন তাঁদের দাম্পত্যজীবনকেও একটি বিশেষ মাত্রা দিয়েছিল।

সম্মান ও স্বীকৃতি

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর বহু গল্প ও উপন্যাস পরবর্তীকালে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।

জনপ্রিয়তা কখনো তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে আড়াল করতে পারেনি। বরং সাধারণ পাঠকের ভালোবাসাই তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখকে পরিণত করেছে।

বুদ্ধদেব গুহের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এখানেই—
তিনি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, অরণ্যকে অনুভব করতে শিখিয়েছেন এবং মানুষের অন্তর্গত একাকিত্বকে চিনতে শিখিয়েছেন।

প্রস্থান

২০২১ সালের আগস্টে অসুস্থ হয়ে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। অবশেষে ২৯ আগস্ট ২০২১, ৮৫ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি কথাশিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।

আজ তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু একজন প্রকৃত লেখকের মৃত্যু কখনো তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু নয়।

আজও কোনো পাঠক যখন ‘মাধুকরী’ খুলে বসেন,
কোনো কিশোর যখন ঋজুদার সঙ্গে অরণ্যে পা বাড়ায়,
কিংবা কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ যখন তাঁর কোনো উপন্যাসের পাতায় প্রকৃতির কাছে আশ্রয় খোঁজেন—
তখন বুদ্ধদেব গুহ আবার ফিরে আসেন।

ফিরে আসেন তাঁর অরণ্যের গন্ধ হয়ে,
বৃষ্টিভেজা পাতার শব্দ হয়ে,
দূর পাহাড়ের নীল নীরবতা হয়ে,
অথবা সন্ধ্যার জঙ্গলে অদৃশ্য কোনো পাখির ডাকে।

মানুষটি চলে গেছেন—
কিন্তু তাঁর অরণ্য এখনও বেঁচে আছে।
তাঁর চরিত্রগুলো এখনও হাঁটে।
তাঁর গল্প এখনও কথা বলে।
তাঁর প্রকৃতি এখনও পাঠকের হৃদয়ে বাতাস তোলে।

বুদ্ধদেব গুহ তাই শুধু একজন কথাসাহিত্যিক নন—
তিনি বাংলা সাহিত্যের সেই অরণ্যচারী কথক, যিনি শহুরে জীবনের ক্লান্ত মানুষকে বারবার নিয়ে গেছেন সবুজের গভীরে, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষ একাকার হয়ে যায়।

আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, অরণ্যের সেই অনন্য কথাশিল্পীকে।

বুদ্ধদেব গুহ—
আপনি নেই,
কিন্তু আপনার অরণ্য আছে।
আর সেই অরণ্যের পথ ধরে
আপনি পাঠকের হৃদয়ে
চিরকাল হেঁটে যাবেন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।