স্মরণ — বাংলা নাটকের শিকড়সন্ধানী নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

বাংলা নাটকের শিকড় যেখানে লোকজ জীবন, মাটি, মানুষ ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত—সেখানেই এক অনন্য শিল্পদ্রষ্টা হিসেবে দীপ্যমান নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তিনি শুধু একজন নাট্যকার নন; বাংলা নাটকের স্বতন্ত্র নন্দনতত্ত্ব নির্মাণে তিনি ছিলেন এক নিরলস গবেষক, নাট্যতাত্ত্বিক, নির্দেশক, সংগঠক ও শিক্ষক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে তিনি পাশ্চাত্য অনুকরণ থেকে বের করে বাংলার নিজস্ব লোকঐতিহ্য, ইতিহাস, পুরাণ ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছিলেন।

সেলিম আল দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনী জেলার সোনাগাজীর সেনেরখিল গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটকের ওপর গবেষণা করে ১৯৯৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বিজ্ঞাপন সংস্থা বিটপী-তে কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৮৬ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র ধারার বিকাশ ঘটে।

মাত্র তরুণ বয়সেই তাঁর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ। ১৯৬৮ সালে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ‘নিগ্রো সাহিত্য’। তাঁর প্রথম রেডিও নাটক ‘বিপরীত তমসায়’। ১৯৭০ সালে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘ঘুম নেই’। ১৯৭২ সালে মঞ্চস্থ হয় তাঁর প্রথম মঞ্চনাটক ‘সর্পবিষয়ক গল্প’।

সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনার কেন্দ্রে ছিল বাংলার মানুষ, বাংলার মাটি এবং বাংলার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের নাটকের নিজস্ব ভাষা ও আঙ্গিক খুঁজে নিতে হলে ফিরে যেতে হবে লোকনাট্য, পালাগান, কীর্তন, মঙ্গলকাব্য, গাথা, পুরাণ ও গ্রামীণ জনজীবনের কাছে। তাঁর নাটকে তাই একই সঙ্গে ধরা পড়ে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া, লোকজীবনের প্রাণস্পন্দন এবং আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট।

১৯৮২ সালে নাট্যনির্দেশক নাসিরউদ্দীন ইউসুফ-এর সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রাম থিয়েটার। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ জনপদে নাট্যচর্চার বিস্তার ঘটে এবং বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন পায় এক নতুন মাত্রা।

তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বিস্ময়করভাবে বিস্তৃত। তিনি মঞ্চ, রেডিও ও টেলিভিশনের জন্য নাটক রচনার পাশাপাশি গবেষণা, নির্দেশনা, চিত্রনাট্য, কবিতা, গান, অনুবাদ ও উপন্যাস রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে—‘সর্পবিষয়ক গল্প’, ‘মুনতাসির’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘হরগজ’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’ প্রভৃতি। তাঁর নাট্যকর্মে লোকজ ঐতিহ্য ও আধুনিক নাট্যভাষার যে সৃজনশীল সমন্বয় ঘটেছে, তা বাংলা নাট্যসাহিত্যে তাঁকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা।

‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’ কিংবা ‘নিমজ্জন’—প্রতিটি নাটকেই তিনি মানুষের জীবন, স্বপ্ন, বেদনা, ইতিহাস ও অস্তিত্বকে নতুন শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর নাট্যভাষা একই সঙ্গে কাব্যিক, লোকজ, দার্শনিক ও গভীরভাবে মানবিক।

বাংলা নাটকে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননা। তাঁর গবেষণা ও সৃজনশীল কর্ম বাংলা নাট্যচর্চাকে দিয়েছে এক সমৃদ্ধ বৌদ্ধিক ভিত্তি; আর তাঁর ছাত্র-সহকর্মী ও উত্তরসূরিদের মাধ্যমে তাঁর নাট্যভাবনা আজও প্রবাহমান।

সেলিম আল দীন ছিলেন এমন এক নাট্যকার, যিনি নাটককে কেবল মঞ্চের বিনোদন হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন জাতির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে। তিনি নাটকের ভাষায় খুঁজেছেন বাংলার মানুষের হাজার বছরের স্মৃতি, লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ এবং ইতিহাসের অন্তর্লীন মানবিক সত্য।

২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা নাটকের এই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর প্রস্থান বাংলা নাট্যাঙ্গনে সৃষ্টি করেছিল এক গভীর শূন্যতা। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হয়, শিল্পের নয়। তাঁর নাটক, গবেষণা, নাট্যভাবনা এবং বাংলার শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আহ্বান আজও আমাদের নাট্যচর্চাকে পথ দেখায়।

সেলিম আল দীন তাই কেবল একটি নাম নন—তিনি বাংলা নাটকের শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক দীপ্ত আহ্বান, আমাদের নাট্যঐতিহ্যের এক অনিবার্য অধ্যায়, এক অনন্ত সৃজনের নাম।

বাংলা নাটকের এই শিকড়সন্ধানী মহান নাট্যাচার্যের জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ছালাম।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

ratul Khaborwala

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর