স্মরণ ব্যারিস্টার স্নেহাংশুকান্ত আচার্য রাজপরিবারের সন্তান, মানুষের আইনজীবী

বিত্ত ও বৈভবের উত্তরাধিকার পেয়েও যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সাধারণ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পক্ষে—তিনি ব্যারিস্টার স্নেহাংশুকান্ত আচার্য। তিনি ছিলেন একাধারে খ্যাতনামা বাঙালি আইনজীবী, বামপন্থী রাজনীতিক, মানবতাবাদী এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক নিষ্ঠাবান কর্মী।

১৯১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী রাজপরিবারে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন মহারাজ শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর কনিষ্ঠ সন্তান। জন্মসূত্রে বিপুল বিত্ত ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হলেও স্নেহাংশুকান্তের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে—ক্ষমতা ও প্রাচুর্যের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কঠিন পথ।

১৯৩৬ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিএ পাস করে ব্যারিস্টারি পড়তে তিনি লন্ডনে যান। সেখানে অবস্থানকালে তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহলের। পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে তিনি গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চতর নেতৃত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

লন্ডনের জীবন তাঁকে বদলে দিয়েছিল। রাজপরিবারের সন্তান হয়েও শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবন, অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্ম নেয়। দেশে ফিরে সেই আদর্শকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তাঁর কাছে আইন ছিল শুধু জীবিকা নয়—আইন ছিল নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ময়মনসিংহ থেকে বহিষ্কার করে। সেই সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ অঞ্চলে তিনি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মানুষের দুঃসময়ে ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা শ্রেণির বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই বাস্তব প্রয়োগ।

১৯৪৭ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু স্বাধীনতার পরও তাঁর সংগ্রাম থেমে থাকেনি। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে দীর্ঘ সময় বিনা বিচারে কারাবন্দি থাকতে হয় তাঁকে—১৯৬৩ সাল পর্যন্ত জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের দীর্ঘ এক অধ্যায়।

কারাগারে কাটানো সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তিনি ইংরেজিতে লিখে রেখে যান। পরবর্তীতে তাঁর সেই জেলজীবনের স্মৃতিকথা বাংলায় অনূদিত হয়ে ‘জেলখানার ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে এসেছে একজন রাজনৈতিক বন্দির জীবন, সংগ্রাম, নিঃসঙ্গতা এবং বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার কাহিনি।

পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-তে যোগ দেন। ছয় বছর তিনি রাজ্য বিধানসভার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তবে তাঁর সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়গুলোর একটি ছিল—আইনের জগতে তাঁর অসামান্য অবদান। ব্যারিস্টার ও আইনজীবী হিসেবে তিনি অর্জন করেছিলেন বিশেষ খ্যাতি। ১৯৫৭ সালে এফ্রো-এশীয় আইনজীবী সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। পরের বছর, ১৯৫৮ সালে, তিনি সারা ভারত গণতান্ত্রিক আইনজীবী সংঘের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম এডভোকেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পুনরায় পশ্চিমবঙ্গের এডভোকেট জেনারেল নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনেও স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের জীবন ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি বিবাহ করেন কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নারী নেত্রী সুপ্রিয়া মুখোপাধ্যায়কে। এই সূত্রে তিনি ছিলেন সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের জামাতা এবং প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের শ্যালক।

তাঁর দানশীলতা ও শিক্ষানুরাগের একটি উজ্জ্বল স্মারক হয়ে আছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। মাত্র এক টাকা মূল্যে দানপত্র করে দেওয়া তাঁর জমিতেই প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছিল এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।

রাজপরিবারের ঐশ্বর্য তাঁর জন্মপরিচয় ছিল, কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রকৃত পরিচয়। আদালতে তিনি লড়েছেন ন্যায়বিচারের জন্য, রাজপথে লড়েছেন গণতন্ত্রের জন্য, আর জীবনের দীর্ঘ কারাবাসেও আঁকড়ে রেখেছেন তাঁর আদর্শ ও বিশ্বাস।

১৯৮৬ সালের ২৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন ব্যারিস্টার স্নেহাংশুকান্ত আচার্য। তাঁর প্রয়াণে শেষ হয়েছিল একটি জীবন; কিন্তু শেষ হয়নি তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, মানবিকতা ও সংগ্রামের উত্তরাধিকার।

বিত্তের প্রাসাদ ছেড়ে যিনি মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন,
আইনের পোশাক পরে যিনি ন্যায়ের পক্ষে লড়েছিলেন,
কারাগারের অন্ধকারেও যিনি বিশ্বাসের আলো নিভতে দেননি—
সেই ব্যারিস্টার স্নেহাংশুকান্ত আচার্য আজও স্মরণীয় তাঁর কর্মে, আদর্শে ও মানবিকতায়।

বিনম্র শ্রদ্ধা ও স্মরণ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।