নাটোরের লালপুরে প্রায় ৬০ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে চাঞ্চল্যকর ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান অতিথি হিসেবে পছন্দের ব্যক্তিকে না রাখায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাবেক এক ছাত্রদল নেতা মাইকিং করে মাঠে ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়েছে বলে ঘোষণা দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ঘোষণা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বেআইনি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল ম্যাচটি বন্ধ হয়ে যায়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) উপজেলার কেশবপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কেশবপুর গ্রামে প্রায় ছয় দশক ধরে নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়ে আসছে। গ্রামবাসীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই খেলায় রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অতিথি করার প্রচলন নেই। বরং খেলা শেষে গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি, বয়োজ্যেষ্ঠ কিংবা প্রধান ব্যক্তিরাই বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতিই এবারের আয়োজনেও বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের টুর্নামেন্টটি প্রায় ১৫ দিন আগে শুরু হয়। এতে স্থানীয় কলেজ, উচ্চবিদ্যালয়, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের দলও অংশ নেয়। কয়েক ধাপের প্রতিযোগিতা শেষে শুক্রবার জুমার নামাজের পর ফাইনাল ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
আয়োজক কমিটির সদস্য মাহবুবের দাবি, টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই লালপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মারুফ আলী ফাইনাল খেলায় লালপুরের সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মলামকে প্রধান অতিথি করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে নিজেকেও বিশেষ অতিথি করার কথা বলেন তিনি।
তবে আয়োজকরা জানান, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও স্থানীয় রীতি বিবেচনায় তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অতিথি না করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। ফলে মারুফ আলীর দাবি গ্রহণ করা হয়নি।
এরপর শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে মারুফ আলী নিজ উদ্যোগে মাইক ভাড়া করে কেশবপুর গ্রামে প্রচার চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। মাইকিং করে তিনি ঘোষণা দিতে থাকেন, খেলার মাঠে ‘১৪৪ ধারা’ জারি করা হয়েছে এবং সেখানে কেউ খেলতে পারবেন না।
এই ঘোষণার পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরি হয়। ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে আগে থেকেই জমে ওঠা উৎসবের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায়। একপর্যায়ে ম্যাচটি আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গ্রামপ্রধান আজিজুর রহমান বলেন, ভিত্তিহীন ঘোষণার কারণে একটি সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
অপর গ্রামপ্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া ‘১৪৪ ধারা’ জারি করা যায় না। তার অভিযোগ, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মারুফ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘১৪৪ ধারা’ জারির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে নজরুল ইসলাম মলাম বলেন, তাকে ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি করার জন্য তিনি কাউকে কোনো নির্দেশ দেননি। বিষয়টি জানার পর মারুফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে অতিথি নির্বাচন নিয়ে বিরোধ এবং তার জেরে এমন বিভ্রান্তিকর ঘোষণা পুরো আয়োজনকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বহু বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে।


