খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৫
নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে ইউক্রেন। সুইডেনের তৈরি অত্যাধুনিক গ্রিপেন যুদ্ধবিমান শিগগিরই ইউক্রেনের বিমানবাহিনীতে যোগ হতে যাচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মধ্যেই এই বিমানগুলো ইউক্রেনের আকাশে ওড়বে।
সম্প্রতি সুইডেন ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার আওতায় ইউক্রেন ১০০ থেকে ১৫০টি জেএএস-৩৯ মডেলের গ্রিপেন-ই যুদ্ধবিমান কিনবে। এটি সুইডেনের অন্যতম আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট হিসেবে পরিচিত।
সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেছেন, এই প্রকল্পটি ১০ থেকে ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া, যার সরবরাহ তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ইউরি ইহনাত জানান, যুদ্ধবিমান কেনা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এসব চুক্তি আন্তঃসরকার পর্যায়ে হয় এবং সময়সাপেক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন প্রথমে গ্রিপেন ই নয়, বরং পুরোনো সি/ডি মডেলগুলো পেতে পারে। তবুও তারা মনে করছেন, এই বিমানগুলোর সংযোজন ইউক্রেনের বিমান সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
গ্রিপেন জেট তার গতি, বহুমুখী ক্ষমতা, উন্নত রাডার এবং কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এটি আকাশ থেকে আকাশে, আকাশ থেকে স্থলে এবং নজরদারি মিশনে সমানভাবে কার্যকর। সর্বশেষ সংস্করণ গ্রিপেন ই, জেনারেল ইলেকট্রিকের এফ৪১৪জি ইঞ্জিনে চালিত, যা ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ১৩০ কিলোমিটার গতিতে (ম্যাক ২) উড়তে পারে। উন্নত রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং বৃহৎ প্যানোরামিক ডিসপ্লে যুক্ত এই বিমানটি পাইলটকে বাস্তব সময়ের যুদ্ধক্ষেত্রের পূর্ণ চিত্র দেয়।
২০২৫ সালের মে মাসে গ্রিপেন ই ইতিহাস সৃষ্টি করে যখন এটি প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা পরিচালিত হয়। ‘সেন্টোর’ নামে পরিচিত এই এআই পাইলট তিনটি ফ্লাইট মিশন সম্পন্ন করে, যা বিমানের উন্নত বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ যুদ্ধক্ষমতা প্রদর্শন করে।
পুরোনো গ্রিপেন সি/ডি মডেল তুলনামূলকভাবে কম উন্নত হলেও এখনো শক্তিশালী মাল্টিরোল ফাইটার। এটি ভলভো আরএম১২ ইঞ্জিনে চলে। ওজন ও জ্বালানি ধারণক্ষমতা কিছুটা কম হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
গ্রিপেনের অন্যতম শক্তি হলো এর বহুমুখী অস্ত্রসজ্জা। এটি মেটিওর ও এআইএম-১২০ এএমআরএএম ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দূরপাল্লার আক্রমণ চালাতে পারে, আবার আইআরআইএস-টি ও সাইডউইন্ডার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কাছাকাছি যুদ্ধেও সমানভাবে কার্যকর।
সামরিক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রি খারুক বলেন, “গ্রিপেনের বড় সুবিধা হলো এটি মেটিওর মিসাইল বহন করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নেই।” তিনি আরও জানান, সুইডিশ এই বিমানগুলোর তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা মার্কিন লিংক-১৬ সিস্টেমের চেয়েও উন্নত।
আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, গ্রিপেন ছোট রানওয়ে বা সাধারণ সড়ক থেকেও উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। এটি রক্ষণাবেক্ষণে সহজ এবং দ্রুত পুনরায় উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত করা যায়—আদর্শ পরিস্থিতিতে মাত্র ১০ মিনিটেই দ্বিতীয়বার আকাশে উঠতে সক্ষম।
এই বিমানের নকশায় একটি কৌশলগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এর ইঞ্জিনের বায়ুগ্রহণ পয়েন্টগুলো ফিউজলেজের পাশে অবস্থিত, ফলে রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে থেকে উড্ডয়নকালে ধ্বংসাবশেষ ইঞ্জিনে ঢোকার ঝুঁকি কমে যায়। তবে গ্রিপেন ই/এফ সংস্করণে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেশ কয়েকটি যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হওয়ায় এর রপ্তানি ও ব্যবহার নিয়ে ওয়াশিংটনের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে রুশ অস্ত্রগুলো ফ্রন্টলাইনের পেছনে আঘাত হানতে সক্ষম। বিশেষ করে গ্লাইড বোমা ঠেকাতে গ্রিপেনের মেটিওর ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সামরিক বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রঙ্ক বলেন, “শুধু মেটিওরই ৬০-১০০ কিলোমিটার দূরে রুশ সু-৩৪ বোমারু বিমানগুলোকে আঘাত করতে সক্ষম।”
এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে রাশিয়ার ব্রিয়ান্স্ক, কুরস্ক, বেলগোরদ ও রোস্তভ অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতেও পৌঁছাতে পারে। তবে আন্দ্রি খারুক সতর্ক করে বলেন, “গ্রিপেন কোনো অলৌকিক অস্ত্র নয়; এটি শুধু ইউক্রেনের জন্য আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রিপেনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে কতগুলো বিমান ইউক্রেন পায় এবং কত দ্রুত সরবরাহ করা হয় তার ওপর। বর্তমানে সুইডেনের বিমানবাহিনী প্রায় ১০০টি গ্রিপেন পরিচালনা করছে, যার মধ্যে নতুন ও পুরোনো মডেল উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা দেখায়, এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ হতে পারে। দেশটি ২০১৪ সালে গ্রিপেন কেনার চুক্তি করলেও ২০২৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ১০টি বিমান হাতে পেয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সুইডেনের সঙ্গে গ্রিপেনের স্থানীয় উৎপাদনেও একটি চুক্তি হয়েছে। যদিও সময়সূচি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী এক বছরের মধ্যেই ইউক্রেন পুরোনো সংস্করণের প্রায় এক ডজন গ্রিপেন যুদ্ধবিমান পেতে পারে। ইতোমধ্যে গত সেপ্টেম্বরে সুইডেন এর যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে।
সূত্র: কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট
খবরওয়ালা/টিএসএন