খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেকের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। তবে সেই সীমাবদ্ধতাকে পরাজিত করে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলার অসংখ্য উদাহরণও রয়েছে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার পলি রানী সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। জন্ম থেকেই দুই হাতের আঙুল না থাকলেও তিনি কখনো শিক্ষাজীবন থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং শৈশব থেকেই নিজের ডান পাকে লেখার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সেই পা দিয়েই এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিজের অদম্য মনোবল ও অধ্যবসায়ের আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
১৮ বছর বয়সী পলি রানী কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের কন্যা। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। বড় দুই ভাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরিবারের দায়িত্ব সামলে মা রুপালী রানী দীর্ঘদিন ধরে সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
বর্তমানে পলি কাউনিয়া সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পাশের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষাকেন্দ্রে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারেন।
পলির মা রুপালী রানী জানান, জন্মের পর থেকেই মেয়ের দুই হাতের আঙুল ছিল না। হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় কোনোভাবেই কলম ধরা সম্ভব হয়নি। স্বামীকে হারানোর পর সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই তিন সন্তানকে বড় করতে হয়েছে তাকে। আর্থিক কষ্টের পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শও অনেকের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো সেই কথায় কান দেননি। মেয়েও দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিল, সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই পলি নিজের ডান পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করে। প্রথমদিকে কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিন চর্চা করতে করতে একসময় সে সাবলীলভাবে লিখতে শেখে। বর্তমানে তার হাতের লেখার মতোই সুন্দর ও পরিপাটি লেখা দেখে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে সেটি পা দিয়ে লেখা।
পলির শিক্ষাজীবনের শুরুটাও সহজ ছিল না। গ্রামের অনেক মানুষ তার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। বিদ্যালয়ের কিছু সহপাঠীর উপহাসও তাকে কষ্ট দিয়েছে। এসব কারণে অনেক সময় কান্নায় ভেঙে পড়লেও মা তাকে সাহস জুগিয়েছেন। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পলির মা বলেন, তার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় তিনি এ গ্রেড অর্জন করেন। পরে কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতেও এ গ্রেড নিয়ে উত্তীর্ণ হন। এবারও তিনি ভালো ফল করবেন বলে পরিবারের প্রত্যাশা।
সোমবারের পরীক্ষা শেষে পলি রানী জানান, তার পরীক্ষা ভালো হচ্ছে। তিনি আশা করছেন কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারবেন। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা রয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করতে চান তিনি।
পলি বলেন, তিনি কখনো নিজেকে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে ভাবেননি। তার স্বপ্ন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়া। সেই লক্ষ্যেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। সুযোগ পেলে মানুষের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে চান।
কাউনিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, পলি অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে তার জন্য শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষায় তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হচ্ছে, যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে উত্তরপত্র সম্পন্ন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, পলি কখনো নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি এমন একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, যা অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। তার জীবন সংগ্রাম প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাও জয় করা সম্ভব।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, স্বপ্ন, সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে। পলি তার বাস্তব উদাহরণ। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করে তার পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরীক্ষা শেষে তার উত্তরপত্র নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আলাদাভাবে সংরক্ষণ করে বোর্ডে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
পলির গল্প শুধু একজন পরীক্ষার্থীর সংগ্রামের কাহিনি নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং মানবিক শক্তির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। প্রতিকূলতাকে পরাজিত করে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা এই তরুণী আজ প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের সম্ভাবনার শেষ কথা নয়। দৃঢ় সংকল্প, পরিবারের সমর্থন এবং শিক্ষকদের সহযোগিতা থাকলে অসম্ভব বলেও অনেক কিছু সম্ভব হয়ে ওঠে।
মন্তব্য