অবিনাশী শেখ হাসিনা: উন্নয়নের বাতিঘর ও এক প্রতীক্ষিত ভোরের সূর্য

২৮ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও আলোকোজ্জ্বল দিন—শেখ হাসিনার জন্মতিথি। এই দিনটি কেবল একজন মহীয়সী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্মলগ্নের হিসাব নয়, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অদম্য পথচলা ও নতুন করে জেগে ওঠার এক ঐতিহাসিক রূপকথা। স্বাধীনতার স্বপ্ন, বিজয়ের উল্লাস, স্বজন হারানোর সীমাহীন বেদনা, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, দীর্ঘ রক্তপাত, নির্বাসন, রাজপথের অগ্নিঝরা প্রতিরোধ, দেশ গড়ার রূপকল্প এবং অভূতপূর্ব অভ্যুদ্বয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর সুবিশাল রাজনৈতিক জীবনগাথা।

শেখ হাসিনাকে বুঝতে হলে কেবল একজন সরকারপ্রধান হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁকে দেখতে হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের মূল ক্যানভাসে।

স্বপ্নের মশাল ও রক্তে ভেজা ইতিহাস

১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সেই স্বপ্নেরই রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনা। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে জাতির সূর্যকে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সেদিন কেবল একটি পরিবারকে নিঃশেষ করা হয়নি, হত্যা করার অপচেষ্টা হয়েছিল একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে। এর পর বাংলাদেশ প্রবেশ করে সামরিক শাসন, স্বৈরাচার ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার এক দীর্ঘ ঘোর অমানিশায়। যে প্রগতির পথ ধরে দেশের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা থমকে গিয়েছিল বহু বছরের জন্য।

১৯৮১ সালের রূপকথা: আশার আলো হয়ে ফেরা

১৯৭৫ সালের সেই নরকীয় রাতে প্রবাসে থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বিদেশের মাটিতে স্বজন হারানোর তীব্র শোক ও অনিশ্চয়তাকে বুকে চেপে তাঁরা দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু বাংলার আপামর জনতার ভাগ্য পরিবর্তন যার হাত ধরে হওয়ার কথা, ইতিহাস তাঁকে ব্যাকুলভাবে আহ্বান জানাচ্ছিল।

১৯৮১ সালের ১৭ মে। কালবৈশাখীর ঝড়-বৃষ্টির দিনে রাজপথে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেখ হাসিনা স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেই প্রত্যাবর্তন কেবল এক শোকার্ত কন্যার ভিটেমাটিতে ফেরা ছিল না; সেটি ছিল থমকে যাওয়া বাংলাদেশের নতুন করে শ্বাস নেওয়ার দিন।

সামরিক স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম, রাজনৈতিক জোট গঠন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ও বাঙালির প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা, গ্রেপ্তার ও চরম ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে তিনি প্রতিবারই সাধারণ মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছেন অদম্য সাহসের প্রতীক হয়ে।

সোনালী যুগ: বদলে যাওয়া এক দূরন্ত বাংলাদেশ

১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তবে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হয় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দেড় দশকের শাসনামলে। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক বিস্ময়কর উচ্চতায় নিয়ে যান:

  • অবকাঠামো ও সংযোগের বিপ্লব: শতভাগ বিদ্যুতায়ন, বিশ্বমানের সড়ক অবকাঠামো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব জোয়ার।
  • প্রযুক্তি ও ক্ষমতায়ন: ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ব্যাপক প্রসার।
  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: দারিদ্র্য বিমোচন, শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং শতভাগ শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা উদাহরণ হিসেবে ঘোষণা করে।

এই প্রতিটি সাফল্যের পেছনে ছিল কোটি মানুষের শ্রম, কৃষকের অক্লান্ত ঘাম এবং শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বেই বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে।

পদ্মা সেতু: বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদার মহাকাব্য

শেখ হাসিনার দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের প্রিয় পদ্মা সেতু। এটি কেবল ইট-পাথরের কোনো সেতু নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে বাঙালির নিজেদের সক্ষমতা ও আত্মমর্যাদার ঘোষণা।

আন্তর্জাতিক নানামুখী ষড়যন্ত্র ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের পর যখন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন শেখ হাসিনা সাহসের সাথে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। প্রমত্তা পদ্মার বুকে দৃশ্যমান সেই সেতু পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল—বাংলাদেশ কারও কাছে মাথা নত করে না, বাংলাদেশ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে।

পদ্মা সেতুর পর মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক থার্ড টার্মিনাল ও ডজন ডজন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে তিনি দেশের ভৌত মানচিত্রকেই এক আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছেন।

শতবছরের রাষ্ট্রচিন্তা: আগামীর বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার চিন্তা কেবল একটি পাঁচ বছরের নির্বাচনী মেয়াদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সফল করার পর তিনি জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন ‘ভিশন ২০৪১’-এর মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার।

আর এই চিন্তাকে শতবছরের গণ্ডিতে প্রসারিত করে তিনি প্রণয়ন করেছেন ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা ও সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার এই শতবর্ষী পরিকল্পনা প্রমাণ করে—তিনি কেবল আজকের রাজনীতিবিদ নন, তিনি আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ স্থপতি।

থমকে যাওয়া যাত্রা ও দেশবাসীর আকুল প্রতীক্ষা

শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেন এক অদম্য গতিতে ছুটে চলা এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো ২০৪১ সালের উন্নত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে তৈরি হওয়া উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

পরবর্তী দেড়-দুই বছরে (২০২৪-২০২৬) দাঁড়িয়ে আজ দেশের সাধারণ মানুষ ও মেহনতি জনগণ গভীরভাবে উপলব্ধি করছে তাঁর নেতৃত্বের অভাব। অর্থনীতির মন্থর গতি, কর্মসংস্থানের সংকট, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, নিরাপত্তা ও সার্বিক স্থিতিশীলতার যে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা আজ সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

যে বাংলাদেশকে বিশ্ব এক উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে সমীহ করত, সেই বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি আজ থমকে গেছে। ফলে আজ কেবল রাজনৈতিক কর্মী নয়, দেশের মেহনতি কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী ও তরুণ প্রজন্ম—সবাই ব্যাকুলভাবে অনুভব করছে শেখ হাসিনার অদম্য ও অভিভাবকত্বময় নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা। দেশবাসী আজ প্রহর গুনছে, কবে আবার তিনি ফিরবেন এবং দেশের এই অচলাবস্থাকে চাঙ্গা করে আবার উন্নয়ন ও শান্তির সূচনা করবেন।

তিনি ফিরবেন: ভোরের আলো ফুটবেই

ইতিহাসের নানা ঝড়ঝাপটায় বহুবার থমকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেখ হাসিনা প্রতিবারই ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছেন। কারণ তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি—তিনি জনগণের ভালোবাসা ও পরম করুণাময়ের কৃপায় এখনও বেঁচে আছেন, এবং তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে বাস করেন।

যে নেতা শত হত্যাচেষ্টাকে জয় করেছেন, যিনি নিজের সবকিছু হারিয়েও এই জাতির মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছেন, তিনি দেশের এই সংকটে স্থির থাকতে পারেন না। তাঁর ফিরে আসার বার্তা আজ কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

আজকের এই জন্মদিনে তাই আমাদের প্রার্থনা—তিনি দীর্ঘায়ু লাভ করুন, সুস্থ থাকুন।

ইতিহাসের ঘনঘটা কেটে গিয়ে আবার আলো ফুটবেই। যে বাংলাদেশকে তিনি একদা তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে টেনে তুলে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ আবার তাঁর হাত ধরেই তার হারানো গৌরব, শান্তি ও সুবাতাস ফিরে পাবে। কোটি মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি আবার ফিরে আসবেন প্রিয় মাতৃভূমির মানুষের মাঝে—ঠিক যেভাবে ১৯৮১ সালে এসেছিলেন আঁধার ফুঁড়ে আলো জ্বালতে।

শুভ জন্মদিন, মমতাময়ী দেশরত্ন শেখ হাসিনা!

আপনার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে সমগ্র বাংলাদেশ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।