ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের জনপ্রিয় দুই শিল্পী অরিজিৎ সিং ও শান। দুজনের গায়কির ধরন আলাদা হলেও পেশাগত জীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতায় যেন মিলে যায় তাঁদের পথ। অরিজিৎ সিংয়ের প্লেব্যাক থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে শান জানিয়েছেন, তিনিও একসময় গান গাওয়া ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন শান। মেলোডিনির্ভর কণ্ঠ, সহজাত গায়কী এবং রোমান্টিক গানে তাঁর সাবলীলতা তাঁকে শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। ‘চান্দ সিফারিশ’, ‘হে শোনা’, ‘যব সে তেরে নয়না’ এবং ‘বেহেতি হাওয়া সা থা ভো’-এর মতো গান তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অরিজিৎ সিংয়ের গান থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজের জীবনের সেই অধ্যায়ের কথা স্মরণ করেন শান। তাঁর মতে, অরিজিৎ পুরোপুরি গান ছেড়ে দিয়েছেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং পরিস্থিতিকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
শানের ভাষায়, অরিজিৎ এখনো গান করছেন এবং ভবিষ্যতেও তাঁর আরও অনেক প্লেব্যাক গান শ্রোতাদের সামনে আসতে পারে। তাঁর ধারণা, ইতিমধ্যে রেকর্ড করা অরিজিতের বেশ কিছু গান এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে আগামী দিনগুলোতেও তাঁর কণ্ঠে নতুন গান শোনার সুযোগ পাবেন শ্রোতারা।
অরিজিৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে বিষয়ে অবশ্য নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা দিতে চাননি শান। তাঁর মতে, এর প্রকৃত কারণ একমাত্র অরিজিৎ নিজেই বলতে পারবেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, মানুষের সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে বদলাতেও পারে। তাই বর্তমান সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এই প্রসঙ্গেই নিজের ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথা তুলে ধরেন শান। তাঁর বয়স যখন প্রায় ৩৩ বা ৩৪ বছর, তখন তিনিও একই ধরনের মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ততদিনে বিভিন্ন ধরনের গান গেয়ে ফেলেছেন এবং দুই-তিনটি বড় পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।
সাফল্য পাওয়ার পরও তাঁর মনে হয়েছিল, জীবনে নতুন কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল তাঁর মধ্যে। সংগীতের মাধ্যমে যে পরিচিতি ও অবস্থান অর্জন করেছিলেন, তার বাইরে সমাজের জন্যও কিছু করার তাগিদ অনুভব করতেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সংগীতজগতের ব্যস্ততা, নিয়মিত কাজ এবং পেশাগত দায়িত্বের কারণে সেই ইচ্ছা পূরণের মতো সময় বের করতে পারছিলেন না শান। একসময় তাঁর মনে হতে শুরু করে, তিনি যেন একই ধরনের কাজের চক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। সেই পরিস্থিতি থেকেই গান ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা মাথায় এসেছিল বলে জানান তিনি।
তবে শেষ পর্যন্ত শান সংগীত থেকে সরে যাননি। বরং দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গান গেয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য তাই শুধু অরিজিৎ সিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ নয়; এটি তাঁর নিজের জীবনের এমন এক সময়ের স্মৃতিও, যখন জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের মাঝেও পেশাগত জীবনের বাইরে নতুন অর্থ খুঁজতে চেয়েছিলেন তিনি।
অরিজিৎ সিংয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও শানের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারে গান থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার ভাবনা সবসময় চূড়ান্ত বিদায়কে বোঝায় না। সময়, পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই পথও বদলে যেতে পারে।


