কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি গানের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় এবার এসব গানকে শ্রোতাদের কাছে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে অ্যাপল মিউজিক। চলতি বছরের শেষ দিকে প্ল্যাটফর্মটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে—এমন গানে দৃশ্যমান বিশেষ লেবেল যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে গান শোনার সময় সেটি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা ছিল কি না, তা শ্রোতারা সহজেই জানতে পারবেন।
নতুন ব্যবস্থায় কোনো গান তৈরির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে সেই তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব থাকবে গান প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান, রেকর্ড লেবেল ও পরিবেশকদের ওপর। বিশেষ করে কোনো গান যদি মূলত সৃজনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সেবা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটিও এই শ্রেণির মধ্যে পড়বে।
অ্যাপল মিউজিক ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের তথ্য জানানোর জন্য একটি স্বচ্ছতা-ভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে এতদিন এ-সংক্রান্ত তথ্য মূলত গান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই তথ্য সরাসরি শ্রোতাদের সামনে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে একটি গান শুধু কে প্রকাশ করেছে বা কোন শিল্পী গেয়েছেন, সেটিই নয়; গান তৈরিতে প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা ছিল, সে বিষয়েও ধারণা পাওয়া যাবে।
অ্যাপলের নীতিতে কনটেন্ট সরবরাহকারীদের কাছ থেকেই গানের উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো গানের কথা, সুর, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্রের অংশ কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল উপাদান তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে। তবে এই তথ্য যাচাই ও লেবেলিং প্রক্রিয়া কীভাবে কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে অ্যাপল এখনো বিস্তারিত জানায়নি। নির্দিষ্ট কোন তারিখ থেকে শ্রোতারা নতুন লেবেল দেখতে পাবেন, সেটিও ঘোষণা করা হয়নি।
অ্যাপলের সংগীত বিভাগের প্রধান অলিভার শুসার এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রতি মাসে অ্যাপল মিউজিকে নতুন করে যুক্ত হওয়া গানের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। সংখ্যাটি বড় হলেও এসব গানের শ্রোতা তুলনামূলকভাবে খুব কম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর গানের শোনার হার এক শতাংশেরও নিচে।
এই পরিস্থিতি সংগীতশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে প্রযুক্তির সাহায্যে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক গান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে একই ধরনের কনটেন্টের ব্যাপক প্রবাহ সংগীত প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গান তৈরি ও প্রকাশ, কৃত্রিমভাবে শ্রোতা বাড়ানো এবং ভুয়া জনপ্রিয়তা তৈরির মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা সব গানকে একইভাবে দেখা হচ্ছে না। একটি গান পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়া এবং একজন শিল্পী নিজে গান লিখে, গেয়ে বা সুর করে শুধু কোনো প্রযুক্তিগত কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া—দুটি বিষয় এক নয়। নতুন লেবেল ব্যবস্থায় এই পার্থক্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অ্যাপলের উদ্যোগের ফলে সংগীতের উৎস ও নির্মাণপ্রক্রিয়া সম্পর্কে শ্রোতাদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি শিল্পীদের মৌলিক সৃজনশীল কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতেও সহায়ক হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গান তৈরির প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন গানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সে কারণে কোন গান মানুষের সৃজনশীলতার ফল, আর কোন গানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় ভূমিকা রয়েছে—তা স্পষ্টভাবে জানানো সংগীত স্ট্রিমিং পরিষেবাগুলোর জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অ্যাপল মিউজিকের নতুন লেবেল ব্যবস্থা সেই স্বচ্ছতা তৈরির প্রচেষ্টারই একটি অংশ।


