খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ২:৩৭ পিএম
চলতি বছরের শুরুতে নাইজেরিয়ায় সক্রিয় ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা নিজেদের বেশির ভাগ সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এই সামরিক অভিযানকে শতভাগ ‘সফল’ বলে দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাটি নিয়ে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনী বেশ নির্লিপ্ত। তাদের সাফ কথা, মার্কিন সেনারা চলে গেলেও মাঠপর্যায়ে তাদের নিজেদের অভিযানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
গত ডিসেম্বরে লেক চাদ অববাহিকা অঞ্চলে মার্কিন ও নাইজেরীয় বাহিনী একটি বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। গত বছরের বড়দিনের দিন জঙ্গিদের ওপর আচমকা বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে এই বিশেষ অভিযানের সূচনা হয়। এর প্রায় দুই মাস পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে সেখানে প্রায় ২০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। কয়েক মাসব্যাপী চলা এই যৌথ অভিযানে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা আবু-বিলাল আল-মিনুকি নিহত হন। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে বলা হয়, এই অভিযানটি অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং এর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘মার্কিন সেনাদের এই চলে যাওয়া আমাদের নিয়মিত অভিযানের গতিকে কোনোভাবেই ব্যাহত করবে না।’ যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ও সেনা প্রত্যাহার করা হলেও দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা একেবারে বন্ধ হচ্ছে না। নাইজেরীয় মেজর জেনারেল মাইকেল ওনোজো এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী উভয়েই নিশ্চিত করেছে যে, দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আগের মতোই অব্যাহত থাকবে।
নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ওয়াশিংটন এর আগে নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের হাত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার তীব্র অভিযোগ এনেছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক মহল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, নাইজেরিয়ায় মূলত “খ্রিষ্টান গণহত্যা’ চলছে।
নাইজেরিয়া সরকার অবশ্য এই অভিযোগ শুরু থেকেই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। নাইজেরীয় কর্তৃপক্ষের মতে, সে দেশের সহিংসতা অত্যন্ত জটিল এবং এর শিকার সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষই হচ্ছে। একে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ভুল। নাইজেরিয়ায় রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থাগুলোর তথ্যও নাইজেরিয়া সরকারের এই দাবিকে সমর্থন করে। তথ্য অনুযায়ী, জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের সিংহভাগই মূলত মুসলিম। কারণ এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো প্রধানত দেশটির উত্তরাঞ্চলে সক্রিয়, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে।
আফ্রিকায় মার্কিন বিমানবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ড্যাগভিন অ্যান্ডারসন বৃহস্পতিবার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, যৌথ অভিযানের ফলে নাইজেরিয়ায় আইএসের নেতৃত্ব ‘উল্লেখযোগ্যভাবে ভেঙে পড়েছে’। তিনি আরও জানান, এই অভিযানের মাধ্যমে আইএসের স্থানীয় কমান্ড কাঠামো এবং তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইএসের কার্যক্রমে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আইএসের মোট হামলার প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটছে সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে। আর এই অঞ্চলে আইএসের নাইজেরিয়া শাখাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও বিপজ্জনক।
লেক চাদ অববাহিকা অভিযানের জন্য পাঠানো বিশেষ বাহিনীটি প্রত্যাহার করা হলেও, এই অভিযানের আগে থেকেই যেসব মার্কিন সামরিক পরামর্শক নাইজেরিয়ায় অবস্থান করছিলেন, তাঁরা এখনো দেশটিতে রয়ে গেছেন বলে বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন নাইজেরিয়ার সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল সামাইলা উবা। পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়া বর্তমানে বহুমুখী নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় ইসলামপন্থী জঙ্গিদের পাশাপাশি দেশটিতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সশস্ত্র ডাকাত দল ও বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সহিংসতা। একসময় এই দস্যুতা কেবল দেশটির উত্তরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে তা মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর নাইজেরিয়া এই অভ্যন্তরীণ সংকট কীভাবে সামাল দেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
মন্তব্য