আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার শর্তে পেছাতে পারে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ

জাতিসংঘের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্তভাবে উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের পর, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-র কাছে এই প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বৃদ্ধি করে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত করার আবেদন জানায়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত পাঁচ বছরে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ধাক্কার কারণে বাংলাদেশ উত্তরণের জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নিতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তীতে, গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে এই বিষয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সিডিপি একটি ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে, যা গত মঙ্গলবার রাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। তবে সিডিপি আবেদনটি আমলে নিলেও পূর্ণ তিন বছর সময় দেওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময় দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। একই সাথে সংস্থাটি বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণের স্বার্থে আর্থিক ও রাজস্ব খাতসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়েছে।

সিডিপির সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সংস্কারের শর্ত

উত্তরণ পেছানোর আবেদন পাওয়ার পর সিডিপি বাংলাদেশ নিয়ে একটি ‘সংকট মূল্যায়ন’ (ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচকেই (মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা) প্রয়োজনীয় সীমা অনেক ব্যবধানে অতিক্রম করেছে এবং নিকট বা মধ্যমেয়াদে এই সূচকগুলোর নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

সিডিপির মতে, বাংলাদেশ যদি এই বর্ধিত সময়ে তার স্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তবেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি অর্থবহ ও প্রশংসনীয় হবে। সিডিপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রস্তুতিকাল বাড়ানোকে সংস্কার বিলম্বিত করার অজুহাত হিসেবে দেখা উচিত নয়। সংস্থাটির সুপারিশকৃত প্রধান সংস্কার ক্ষেত্রগুলো হলো:

  • আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।

  • অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ: কর রাজস্ব বৃদ্ধি করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের গতিকে ত্বরান্বিত করা।

  • ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রূপান্তরে সরাসরি ভূমিকা রাখে—এমন খাতগুলোতে সরকারি ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

এলডিসি তালিকা ও এযাবৎকাল উত্তরণ হওয়া দেশসমূহ

বর্তমানে বিশ্বে মোট ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রথম এই তালিকা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। গত পাঁচ দশকে সর্বমোট আটটি দেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হতে পেরেছে। নিচে এযাবৎকাল উত্তরণ সম্পন্ন করা দেশ এবং আগামীতে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:

এলডিসি থেকে এ পর্যন্ত উত্তরণ হওয়া ৮টি দেশ আগামী ৫ বছরে উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশ (উদ্ধৃত)

১. ভুটান

 

২. বতসোয়ানা

 

৩. কেপ ভার্দে

 

৪. ইকুয়েটোরিয়াল গিনি

 

৫. মালদ্বীপ

 

৬. সামোয়া

 

৭. ভানুয়াতু

 

৮. সাও টোমো অ্যান্ড প্রিন্সেপ

১. বাংলাদেশ (প্রস্তাবিত ২০২৬)

 

২. নেপাল

 

৩. লাওস

 

(সর্বমোট ৬টি দেশ অপেক্ষমাণ)

বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও পরবর্তী প্রক্রিয়া

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীনস্থ সিডিপি ইতিমধ্যে এই সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি ইকোসকে পাঠিয়েছে। চলতি মাসেই ইকোসকের একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা শেষ পর্যন্ত এক থেকে দুই বছর বাড়তে পারে। তবে এর জন্য বাংলাদেশকে সংকট কাটিয়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পন্থা ইকোসকে জানাতে হবে। ইকোসক তখন নিজেদের মতামতসহ এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠাবে, যেখানে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। যদি ইকোসক সুপারিশ না-ও করে, তবে যৌক্তিক কারণ ও শক্তিশালী দেশের সহায়তা নিয়ে (যেমনটি পূর্বে আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলা পর্তুগালের সহায়তায় করেছিল) সরাসরি সাধারণ পরিষদে আবেদনের সুযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের সিডিপির সদস্য এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই বিষয়ে জানান, সিডিপির এই সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দ্রুততার সঙ্গে সরকারকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং পরিবীক্ষণযোগ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনা জাতিসংঘে জানানো উচিত, যা ইকোসক ও সাধারণ পরিষদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই সংস্কারকে কেবল আর্থসামাজিক অগ্রাধিকার হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা উচিত, কারণ এর মধ্যেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথনকশা নিহিত রয়েছে।

সরকারের জরুরি বৈঠক ও ২৫ খাতের সংস্কার উদ্যোগ

সিডিপির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গতকাল সকালে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি), বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে আর্থিক খাত, রাজস্ব খাত, রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব আইন, দেশি-বিদেশি ঋণের ঝুঁকি হ্রাস, কর অব্যাহতি কমানো, সরকারি সেবায় সুশাসন জোরদার করা, ক্যাশলেস লেনদেন শক্তিশালী করা, বন্দরের খরচ কমানো এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) সম্পাদনসহ মোট ২৫টি খাতের সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংস্কার কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রতি মাসে এর অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তাদের মতামত জানাতে এক সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার তথ্যমতে, মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত পাওয়ার পর চলতি মাসের মধ্যেই সংস্কারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পন্থার প্রতিবেদন জাতিসংঘের ইকোসকে পাঠানো হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।