খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে একটি কামারশালা বা ওয়ার্কশপে কেমিক্যালবাহী ড্রাম কাটার সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণে মো. রায়হান (১২) নামে এক কিশোর শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার লালপুর বাজারে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ড্রামের বিচ্ছিন্ন অংশ ছিটকে ওই শিশুর মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়। এই ঘটনায় ওয়ার্কশপ মালিক লোকনাথ দাস (২৪) নিজেও গুরুতর আহত হয়েছেন।
নিহত রায়হান নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের আকবর হোসেনের ছেলে। সে জীবিকার তাগিদে আশুগঞ্জ লালপুর বাজারের একটি ওয়ার্কশপে কাজ করত। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে ওয়ার্কশপ মালিক লোকনাথ দাস একটি ব্যবহৃত কেমিক্যাল ড্রাম কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ড্রামটির মুখ বা ছিপি দীর্ঘ সময় ধরে শক্তভাবে বন্ধ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাহ্য পদার্থ বা কেমিক্যালবাহী ড্রাম দীর্ঘদিন মুখ বন্ধ অবস্থায় থাকলে ভেতরে উচ্চচাপের দাহ্য গ্যাস তৈরি হয়। লোকনাথ যখন ড্রামটি কাটার জন্য যন্ত্র ব্যবহার করেন, তখন ঘর্ষণে উৎপন্ন তাপ বা আগুনের স্ফুলিঙ্গে ভেতরের গ্যাস বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের ফলে ড্রামের ধাতব অংশ কামানের গোলার মতো ছিটকে এসে পথচারী বা নিকটবর্তী অবস্থানে থাকা রায়হানের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মাথার খুলি ও মগজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সে তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
| বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহতের নাম | মো. রায়হান (১২) |
| পিতার নাম ও ঠিকানা | আকবর হোসেন, চাঁনপুর, রায়পুরা, নরসিংদী |
| আহত ব্যক্তি | লোকনাথ দাস (২৪), ওয়ার্কশপ মালিক |
| ঘটনাস্থল | লালপুর বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| দুর্ঘটনার কারণ | কেমিক্যাল ড্রামের ভেতর জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণ |
| বর্তমান অবস্থা | মরদেহ জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে সংরক্ষিত |
বিস্ফোরণের বিকট শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রায়হানকে উদ্ধার করেন। তাকে দ্রুত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পথেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, আহত ওয়ার্কশপ মালিক লোকনাথ দাসকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সফিউল আলম চৌধুরী দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কেমিক্যাল ড্রাম কাটার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই দুর্ঘটনাটি দেশের ক্ষুদ্র শিল্প ও ওয়ার্কশপগুলোতে বিদ্যমান চরম নিরাপত্তাহীনতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম (যেমন হেলমেট বা প্রোটেক্টিভ গিয়ার) ছাড়াই দাহ্য পদার্থের ড্রাম কাটার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা অপরাধের শামিল। একই সাথে ১২ বছরের একটি শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হওয়া এ দেশের প্রচলিত শিশুশ্রম আইনের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রাম কাটার আগে সেটির মুখ খুলে গ্যাস বের করে দেওয়া বা পানি দিয়ে পূর্ণ করা অপরিহার্য ছিল। এই ন্যূনতম সতর্কতা অবলম্বন করলে হয়তো একটি তাজা প্রাণ ঝরে যেত না।