ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর করা আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের রায় দিয়েছেন। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আসনে তাঁর নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের আর কোনো সুযোগ থাকছে না।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন। নির্ধারিত দিনে আপিল মঞ্জুর করে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়।
এই রায়ের পর আনোয়ার সিদ্দিকীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগ আপিল মঞ্জুর করায় আসলাম চৌধুরী আইনগতভাবে নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। ফলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এবং তাঁর ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করা হবে না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আসলাম চৌধুরী। তবে নির্বাচনের আগেই তাঁর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ায় ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায়ের মাধ্যমে সেই আইনি প্রক্রিয়ার নিষ্পত্তি হলো।
মামলার সূত্রপাত হয় আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। একই আসনের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী অভিযোগ করেন, ঋণখেলাপি হওয়ায় আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য নন। যদিও হাইকোর্ট তাঁর প্রার্থিতা বহাল রাখার আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি (লিভ টু আপিল) চেয়ে আবেদন করেন আনোয়ার সিদ্দিকী।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে গুরুত্বপূর্ণ একটি অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। আদালত নির্দেশ দেন, যদি আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে বিজয়ী হন, তাহলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত নির্বাচনী ফলাফল চূড়ান্ত আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা যাবে না। সেই আদেশের ধারাবাহিকতায় গত ৩১ মার্চ পৃথক আপিল দায়ের করা হয়। পরে ২৮ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত মামলাটি নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান।
এদিকে একই বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি। যমুনা ব্যাংক পিএলসিও একই ধরনের আবেদন করে। এসব আবেদন ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রশ্ন একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আপিল বিভাগ শুনানি পরিচালনা করেন।
মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় গত ১০ জুন আদালত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনগত সহায়তাকারী) হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁরা আদালতে আইনি মতামত উপস্থাপন করেন, যা মামলার নিষ্পত্তিতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুনানিতে আনোয়ার সিদ্দিকীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ। অন্যদিকে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা বা অযোগ্যতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে। এ ধরনের মামলায় আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই প্রার্থিতার বৈধতা নির্ধারণ করে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের এই মামলায় আপিল বিভাগের রায়ের মধ্য দিয়ে সেই আইনি প্রশ্নেরও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পাশাপাশি তাঁর নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পথও বন্ধ হয়ে গেল।
মন্তব্য