খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ দেশের একক বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের বাজার রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউর ১৫টি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো— যেসব দেশে রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশের পোশাকের ঐতিহ্যবাহী ও মূল বৃহৎ বাজার। অন্যদিকে যেসব দেশে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই আয়তনে ও চাহিদায় তুলনামূলক ছোট।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন (বিকেএমইএ) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণে রপ্তানি খাতে এই নিম্নমুখী প্রবণতার তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। ইইউ জোটগতভাবে বাংলাদেশের সার্বিক রপ্তানি আয়ের প্রধানতম উৎস, যা মোট জাতীয় পোশাক রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি জোগান দেয়। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউ অঞ্চলে পোশাক রপ্তানি গড়ে ৩.৩১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের শীর্ষ পোশাক গন্তব্য জার্মানি, যা বিশ্ববাজারে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের ৪৯৫ কোটি ডলার থেকে ১১.৫ শতাংশ কমে ৪৩৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। জার্মানির বাজারে ওভেন পোশাকের চেয়ে নিট পণ্যের (টি-শার্ট, গেঞ্জি ইত্যাদি) চাহিদা বেশি হলেও এবার নিট পোশাকের বাজারেই ধস নেমেছে বেশি। দেশটিতে নিট পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৩ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের রপ্তানি ১০ শতাংশ কমেছে।
ইইউতে পোশাকের তৃতীয় বৃহত্তম বাজার ফ্রান্সে রপ্তানি প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৯৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে চতুর্থ বৃহত্তম বাজার ইতালিতেও পোশাক রপ্তানি প্রায় ৮ শতাংশ কমে ১৪২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। দুটি দেশেই ওভেনের তুলনায় নিট পোশাকে পতনের হার বেশি।
নিচে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউর প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি পরিস্থিতি ও হ্রাসের পরিমাণ সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বাজার / পণ্যের নাম | পূর্ববর্তী অর্থবছর (কোটি ডলারে) | ২০২৫-২৬ অর্থবছর (কোটি ডলারে) | হ্রাসের হার / বিবরণ |
| জার্মানি (মোট পোশাক) | ৪৯৫ | ৪৩৮ | ১১.৫% হ্রাস |
| জার্মানি (নিট পোশাক) | – | ২৬৮ | ১৩% হ্রাস |
| জার্মানি (ওভেন পোশাক) | – | ১৭০ | ১০% হ্রাস |
| ফ্রান্স (মোট পোশাক) | ২১৬ | ১৯৭ | ৯% হ্রাস |
| ইতালি (মোট পোশাক) | ১৫৪ | ১৪২ | ৮% হ্রাস |
| ডেনমার্ক | ১০৪ | ৯৪ | ১০% হ্রাস |
| বেলজিয়াম | ৫৫ | ৫৩ | ৫% হ্রাস |
| চেক রিপাবলিক | ৩২ | ৩১ | হ্রাস পেয়েছে |
| আয়ারল্যান্ড | ২৫ | ২৩ | ১০%-এর বেশি হ্রাস |
| রোমানিয়া | ২৩ | ১৮ | ২০% হ্রাস (সর্বোচ্চ) |
(নোট: এ ছাড়া পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ এবং মাল্টাতেও পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।)
ইউরোপের বাজারে নিট পোশাকের রপ্তানি বেশি কমার পেছনে বহুমুখী কারণ চিহ্নিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান ব্যাখ্যা করেন যে, নিট পোশাকে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের (Local Value Addition) পরিমাণ গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ। স্থানীয় কাঁচামাল ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং শ্রম অসন্তোষের মতো নেতিবাচক প্রভাবগুলো সর্বগ্রে নিট খাতেই গিয়ে আঘাত হানে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে:
বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি ও শুল্কায়নের প্রভাব: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কাল থেকে শুরু হওয়া অতিরিক্ত শুল্কনীতি বৈশ্বিক চাহিদা কমিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
প্রতিযোগী দেশের আগ্রাসী উপস্থিতি: মার্কিন বাজারে কড়াকড়ি থাকায় চীন ও ভারতের মতো প্রভাবশালী প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের নজর ইইউ বাজারের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছে।
উৎপাদন খরচ ও সক্ষমতা: দেশে জ্বালানি সংকট, মজুরি বৃদ্ধি ও পরিচালনা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশি পোশাকের মূল্য-প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
সবকটি প্রধান বাজারে মন্দা দেখা গেলেও ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য স্পেনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দেশটিতে ৬ শতাংশ রপ্তানি বেড়ে আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার (যা আগে ছিল ৩৪০ কোটি ডলার)। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি ও স্লোভেনিয়ার মতো তুলনামূলক ছোট বাজারগুলোতে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ছিল।
চূড়ান্ত হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউ অঞ্চলে মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১,৯০৬ কোটি ডলারে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ১,৯৭১ কোটি ডলারের চেয়ে কমেছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক পোশাক রপ্তানিতে ইইউর অংশ ৫০.১০ শতাংশ থেকে কমে ৪৯.২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের প্রধান এই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতকে টিকিয়ে রাখতে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান ও পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য