খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে সমাহিত এক ব্যক্তির অক্ষত লাশ মেলাকে কেন্দ্র করে চরম বিস্ময় ও কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে। মরহুম স্ত্রীর দাফনের উদ্দেশ্যে কবর খনন করার সময় প্রায় ২৪ বছর পূর্বে দাফন করা স্বামী রমজান আলীর দেহ কাফনের কাপড়সহ অক্ষত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। এই বিস্ময়কর ঘটনার খবর জানাজানি হতেই পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ উলুপাড়া গ্রামে ভিড় জমান। পরম শ্রদ্ধায় ও কৌতুহলে থমকে গেছে পুরো এলাকা।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, উপজেলার উত্তর হাওলা ইউনিয়নের উলুপাড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মরহুম রমজান আলীর স্ত্রী গত শুক্রবার বার্ধক্যজনিত কারণে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পারিবারিক সম্মতিক্রমে গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে প্রয়াত স্বামীর কবরের ঠিক পাশেই স্ত্রীকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
নির্ধারিত স্থানে কবর খননকারীরা মাটি খোড়া শুরু করলে একপর্যায়ে তারা থমকে যান। ২৪ বছর আগে দাফন করা রমজান আলীর লাশটির কোনো ক্ষতি তো হয়ইনি, উপরন্তু কাফনের সাদা কাপড়টিও অক্ষত ও পরিচ্ছন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। কবর খননকারীদের এই দাবির পর তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে উলুপাড়া জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। স্বচক্ষে ঘটনাটি দেখার পর তিনি জানান, “কবরের ভেতরে কাফনে মোড়ানো দেহটি অলৌকিকভাবে অক্ষত ছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৎ ও পরহেজগার বান্দাদের আল্লাহ তাআলা মাটিতে পচতে দেন না। আমরা পবিত্রতা ও সম্মান বজায় রেখে মরদেহটি পূর্বের স্থানে অক্ষত অবস্থায় রেখে তার পাশেই স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন করার দিকনির্দেশনা দিই।”
এলাকার প্রবীণ ও স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে মারা যাওয়া রমজান আলী জীবদ্দশায় অত্যন্ত সাদা মনের ও খোদাভীরু মানুষ ছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন চাল-আটার ব্যবসায়ী। হাটবাজারে সততার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং সর্বদা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায় করতেন। গ্রামের মানুষের সাথে তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অমায়িক ও মার্জিত। এলাকাবাসীর মতে, তার এই ধার্মিক ও সৎ জীবনযাপনের প্রতিদান হিসেবেই মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে এ অলৌকিক সম্মান দান করেছেন।
সাধারণ মানুষের অলৌকিক বিশ্বাসের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মানবদেহ দাফনের পর স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীবের প্রভাবে খুব দ্রুত পচনশীল হলেও বিশেষ কিছু কারণে দেহ দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে।
কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রেজা মোহাম্মদ সারওয়ার আকবর এই প্রসঙ্গে জানান, “সাধারণত মাটি, তাপমাত্রা এবং অণুজীবের সক্রিয়তার ওপর লাশের পচন নির্ভর করে। যদি কবরের ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বায়ুরোধক (এয়ারটাইট) হয়, আর্দ্রতা ও অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকে কিংবা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার না ঘটে, তবে মমি প্রক্রিয়ার ন্যায় দেহ বহু বছর পচনহীন থেকে যেতে পারে।” তবে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পোস্টমর্টেম বা ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার এই চমৎকার মেলবন্ধনে মনোহরগঞ্জের এই ঘটনাটি বর্তমানে ওই অঞ্চলের অন্যতম বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য