খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১:৪ পিএম
রংপুরে ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) পদে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। ভুয়া প্রবেশপত্র তৈরি ও প্রক্সি পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের চেষ্টার অভিযোগে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে রংপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মচারীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই চক্রটি ১৭ লাখ টাকার মোটা অঙ্কের বিনিময়ে চাকুরিপ্রার্থীদের প্রতারণার জালে ফেলত। ঘটনায় জড়িত অন্য সদস্যদের ধরতেও পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র এলাকায়। ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কেন্দ্রের মূল ফটকে দায়িত্বরত গোয়েন্দা সদস্যদের নজর পড়ে মো. আশরাফুল ইসলাম নামের এক তরুণের ওপর। তার চলাফেলা ও গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ তাকে থামিয়ে কাছে থাকা পরীক্ষার প্রবেশপত্রটি যাচাই-বাছাই করে। পুলিশের সূক্ষ্ম অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রবেশপত্রটি সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
একই সময়ে সেই কেন্দ্রের বাইরে থেকে আসল পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে ‘প্রক্সি’ হিসেবে পরীক্ষা দিতে আসা তাজমিলুর রহমান নামের অপর এক তরুণকেও হাতেনাতে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আটককৃত আশরাফুল ইসলামকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে প্রতারণার এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলের কথা। ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) পদে চাকরি পাওয়ার জন্য তিনি নিয়োগের অন্যতম প্রাথমিক ও বাধ্যতামূলক ধাপ—শারীরিক যোগ্যতা যাচাই বা শারীরিক পরীক্ষাতেই কখনো অংশগ্রহণ করেননি।
তা সত্ত্বেও প্রতারক চক্রটি তাকে সরাসরি লিখিত পরীক্ষায় বসানোর নিশ্চয়তা দেয়। এ জন্য ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের রংপুর কার্যালয়ের কর্মচারী বাদশা মাসউদ আলম ও তার সহযোগী নুরুল ইসলামের সঙ্গে মোট ১৭ লাখ টাকার চুক্তি হয় আশরাফুলের। চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিক অগ্রিম হিসেবে দিনাজপুর থেকে ঢাকা ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমাও দেন তিনি। টাকা পাওয়ার পর চক্রটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-এর মাধ্যমে আশরাফুলকে একটি ভুয়া প্রবেশপত্র পাঠিয়ে দেয়, যা নিয়ে তিনি সোজা কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন।
| ক্র. নং | নাম | বয়স | ঠিকানা/পরিচয় | মামলায় বর্তমান অবস্থা |
| ১ | মো. আশরাফুল ইসলাম | ২১ | পার্বতীপুর, দিনাজপুর | গ্রেফতার |
| ২ | মো. তাজমিলুর রহমান | ১৯ | রংপুর | গ্রেফতার (প্রক্সি পরীক্ষার্থী) |
| ৩ | মো. বাদশা মাসউদ আলম | ৪৮ | কর্মচারী, ফায়ার সার্ভিস, কামালকাছনা, রংপুর | গ্রেফতার (মূল পরিকল্পনাকারী) |
| ৪ | নুরুল ইসলাম | ২০ | রংপুর | গ্রেফতার |
| ৫ | মো. নুরুল ইসলাম | ৪৬ | রংপুর | পলাতক (অভিযুক্ত) |
গ্রেফতার হওয়া আশরাফুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ রংপুর নগরীর ব্যস্ততম জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকায় তাৎক্ষণিক এক ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখান থেকে জালিয়াতি চক্রের অন্যতম সমন্বয়ক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মচারী বাদশা মাসউদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে তল্লাশি চালানো হলে সেখানে অর্থ লেনদেনের মেসেজ, জালিয়াতির প্রমাণ এবং ভুয়া প্রবেশপত্র তৈরির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত বাদশা মাসউদ স্বীকার করেন যে, তিনি পলাতক আসামিদের সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই জালিয়াতি চক্র পরিচালনা করছিলেন। তারা সরকারি চাকুরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ প্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এবং কাজ হাসিল করতে তারা বিভিন্ন সময় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভুয়া পরিচয় ধারণ করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করত।
এই জালিয়াতির ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলাটিতে চারজনকে গ্রেফতার দেখানো ছাড়াও আরও একাধিক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কোতোয়ালি মেট্রোপলিটন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের জানান, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কলঙ্কিত করার এই অপচেষ্টায় বড় কোনো নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক আসামি নুরুল ইসলামসহ প্রতারক চক্রের অন্য সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি তল্লাশি ও গোয়েন্দা অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
মন্তব্য