ইউক্রেনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে লক্ষ্য করে গত শনিবার ভোররাতে এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। কয়েকশ ড্রোন ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের এই সমন্বিত আক্রমণে দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কিয়েভ এই হামলাকে যুদ্ধকালীন ইতিহাসে অন্যতম বড় বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির হিমাঙ্কের নিচের তীব্র শীতের এই সময়ে এমন আক্রমণ সাধারণ ইউক্রেনীয়দের চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, শনিবার ভোররাতে রুশ বাহিনী চারশরও বেশি ড্রোন এবং প্রায় ৪০টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলা পরিচালনা করে। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল বিদ্যুৎ গ্রিড, মূল উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিতরণ সাবস্টেশনগুলো। রুশ বাহিনীর এই কৌশলী হামলায় ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় খমেলনিৎস্কাইয়ে, রিভনে, তের্নোপিল এবং লভিভসহ বেশ কিছু অঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিশ শমিহাল টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জানান যে, হামলায় পশ্চিম ইউক্রেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র— বুরশতিন ও দব্রোৎভির মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানায় দেশজুড়ে জরুরিভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
হামলার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন | ৪০০-এর অধিক (শহীদ ড্রোনসহ অন্যান্য) |
| ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র | প্রায় ৪০টি (ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল) |
| আক্রান্ত প্রধান অবকাঠামো | বুরশতিন ও দব্রোৎভির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবস্টেশন ও গ্রিড। |
| বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কবলে অঞ্চল | লভিভ, রিভনে, তের্নোপিল, ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক ও কিয়েভ। |
| আবহাওয়া পরিস্থিতি | তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামার শঙ্কা। |
| জরুরি ব্যবস্থা | পোল্যান্ড থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু। |
শীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) অভিযোগ করেছেন যে, মস্কো বর্তমানে ‘কূটনীতির বদলে হামলাকে’ তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তীব্র শীত ও শৈত্যপ্রবাহকে ইউক্রেনীয় জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। ঘরবাড়ি উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা বা হিটিং সিস্টেম অচল করে দিয়ে মানুষকে নতি স্বীকারে বাধ্য করাই এই হামলার মূল উদ্দেশ্য।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইউক্রেনের তাপমাত্রা মাইনাস ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ না থাকা এক চরম সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মেরামত কাজ
জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিশ শমিহাল জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেই প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলো মেরামতের কাজে নামবেন। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলায় ইউক্রেন সরকার পোল্যান্ডসহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট হামলা নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া না গেলেও, মস্কো বরাবরই ইউক্রেনের সামরিক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে হামলা চালানোকে তাদের কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দাবি করে আসছে। তবে বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোতে এই হামলা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।



